নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
প্রশাসনিক অচলাবস্থা, মালিকানা দ্বন্দ্ব ও আইনি জটিলতা নিরসনের দাবিতে আজ চট্টগ্রাম সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (এসইউবি) ক্যাম্পাসে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা এক বিশাল বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে। শত শত প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী সমাবেশে অংশ নিয়ে ক্যাম্পাসে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় ৫ দফা দাবি তুলে ধরে।
বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, “হাইকোর্ট থেকে শুরু করে জজকোর্ট পর্যন্ত একাধিক মামলা-মোকদ্দমার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। ট্রাস্টি বোর্ডের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও মালিকানা নিয়ে টানাটানির খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। এভাবে একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না।”
শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত ৫ দফা দাবি
১. প্রশাসনিক সমস্যার অবসান: বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান দীর্ঘদিনের কোন্দল, অরাজকতা ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার দ্রুত অবসান ঘটাতে হবে।
২. উপাচার্যসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ: রাষ্ট্রপতি ও ইউজিসি অনুমোদিত উপাচার্য (ভিসি) সহ শূন্য ও গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে অবিলম্বে বৈধ নিয়োগ দিতে হবে।
৩. সনদ ও যোগ্যতার স্বীকৃতি: সনদ ও শিক্ষাগত যোগ্যতার স্বীকৃতিসংক্রান্ত সৃষ্টি হওয়া সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার স্থায়ী সমাধান করতে হবে।
৪. শিক্ষার্থীদের অধিকার সুরক্ষা: প্রশাসনিক সংকটের কারণে দেশ-বিদেশে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের حقوق ও ক্যারিয়ারের পূর্ণ সুরক্ষা দিতে হবে।
৫. সংকটের স্থায়ী সমাধান: একের পর এক রিট ও মামলার সংস্কৃতি বন্ধ করে অবিলম্বে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক শিক্ষা ও একাডেমিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।
সমাবেশ থেকে শিক্ষার্থীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “মালিকানা ও ট্রাস্টি বোর্ডের অভ্যন্তরীণ মামলা-মোকদ্দমার জাঁতাকলে পড়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জীবন ও ক্যারিয়ার নষ্ট হতে দেওয়া হবে না। যৌক্তিক দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন ও সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।”
সরকারি আদেশ উপেক্ষা ও প্রশাসকের কাজে বাধা
সরকারি আইনি নীতিমালা ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশ মেনে চলা দেশের সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বাধ্যতামূলক হলেও সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি আইনকানুন তোয়াক্কা করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির বিশৃঙ্খলা কাটাতে ২০২৬ সালের ২৫ মে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. ফারুককে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হলেও পরবর্তীতে আদালত রিটটি নিষ্পত্তি করে প্রশাসক নিয়োগকে সম্পূর্ণ বৈধ ঘোষণা করেন।
তবে আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা সত্ত্বেও সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ প্রশাসককে দায়িত্ব পালনে বাধা দিয়ে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, তাকে দাপ্তরিক কার্যক্রমে কোনো সহযোগিতা করা হয়নি এবং আর্থিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সম্পৃক্ত করা হয়নি। উল্টো আইনসিদ্ধ প্রশাসকের উপস্থিতি তোয়াক্কা না করে ট্রাস্টি বোর্ডের পছন্দের ব্যক্তিকে বসিয়ে দাপ্তরিক কাজ চালানো হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ট্রেজারার ড. শরীফ আশরাফুজ্জামানকে ‘ভারপ্রাপ্ত ভিসি’ হিসেবে তুলে ধরে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বসানো হচ্ছে, যা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সাড়ে তিন বছরে ৮ রিট: নেপথ্যে ট্রাস্টি সরোয়ার
আদালতের নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত সাড়ে তিন বছরে সরকারি নানা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অন্তত ৮টি রিট দায়ের করা হয়েছে। ২০২৩ সালে বিওটি চেয়ারম্যান খলিলুর রহমানের দায়ের করা এক রিটের কারণে শিক্ষকদের বেতন ও ইনক্রিমেন্ট-সংক্রান্ত ব্যাংকিং লেনদেন দীর্ঘসময় বন্ধ ছিল।
পরবর্তীতে ট্রাস্টি সদস্য সরোয়ার জাহান তৎকালীন ভিসি প্রফেসর মোজাম্মেল হকের নিয়োগ ও কার্যরম্বের বিরুদ্ধে একের পর এক রিট ও আপিল করেন। সবশেষ রাষ্ট্রপতির নিয়োগ করা বর্তমান প্রশাসকের বিরুদ্ধেও রিট দায়ের করা হয়। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা জানান, রিটগুলোর সিংহভাগই করেছেন বিতর্কিত বিওটি সদস্য সরোয়ার জাহান।
ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম ও সনদ জালিয়াতি
২০২১ সালে চুয়েটের সাবেক ভিসি প্রফেসর প্রকৌশলী মোজাম্মেল হক সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির ভিসি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাস্টি সদস্য সরোয়ার জাহানের নানা আর্থিক দুর্নীতির নথিপত্র উন্মোচন করেন। পরবর্তীতে ইউজিসির ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সরোয়ার জাহান ও তাঁর স্ত্রী ইসরাত জাহানের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতি ও ব্যাপক সনদ জালিয়াতির প্রমাণ মেলে।
ইউজিসির প্রতিবেদনে বলা হয়:
১. তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০-এর অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ধারা লঙ্ঘন করেছেন।
২. ইসরাত জাহান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভুয়া ও জাল সনদ গ্রহণ করেছেন এবং একই সাথে অবৈধ লাভজনক পদে কর্মরত আছেন।
৩. সরোয়ার জাহান বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলের টাকা দিয়ে নিজের নামে জমি ক্রয় করেছেন।
এসব মারাত্মক অপরাধের ভিত্তিতে পরবর্তীতে সরোয়ার জাহানসহ দুজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা দায়ের করে, যা বর্তমানে বিচারধীন। অনিয়মের তথ্য ফাঁস করায় ২০২৪ সালে বিওটি অবৈধভাবে ভিসি মোজাম্মেল হককে অপসারণের ঘোষণা দেয়, যা শিক্ষা মন্ত্রণালয় অকার্যকর ঘোষণা করে।
অযোগ্য ট্রাস্টি বোর্ড ও ২ হাজার শিক্ষার্থীর সনদ সংকট
বর্তমানে বিওটি চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন খলিলুর রহমান, যিনি ন্যাশনাল ব্যাংকের ৪৫১ কোটি টাকা আত্মসাৎ মামলার আসামি। উচ্চ আদালতের এক শুনানিতে আদালত স্পষ্টভাবে বিওটি চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান, সদস্য সরোয়ার জাহান এবং তাঁর স্ত্রী ইসরাত জাহানকে অযোগ্য ঘোষণা করেন এবং ট্রাস্টি বোর্ডের নিষ্ক্রিয়তার তীব্র সমালোচনা করেন।
আইনজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বৈধ উপাচার্য না থাকায় ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ড. শরীফ আশরাফুজ্জামানের স্বাক্ষর বা মেয়াদে প্রদান করা প্রায় ২ হাজার শিক্ষার্থীর সনদ বেআইনি ও বাতিল বলে গণ্য হতে পারে। ২০০৩ সালে ‘এ জে ফাউন্ডেশন’ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৪ সাল থেকেই জালিয়াতি ও দখলের নানা প্রক্রিয়া চলে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাবেক ভিসির বক্তব্য ও বিওটির নীরবতা
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর মোজাম্মেল হক বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়টি বর্তমানে পুরোপুরি এক ব্যক্তির খেয়ালখুশিমতো চলছে। ট্রাস্টি বোর্ডের অন্য সদস্যরা অযোগ্য ও নীরব। স্বামী-স্ত্রী মিলে জাল সনদের ব্যবসা পরিচালনা এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার এমন নিকৃষ্ট নজির আর কোথাও নেই।”
আজকের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ সমাবেশ ও সার্বিক অনিয়মের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সরোয়ার জাহান ও ভারপ্রাপ্ত ভিসির দায়িত্বে থাকা ড. শরীফ আশরাফুজ্জামানকে ফোন করা হলেও তারা মোবাইল রিসিভ করেননি।