প্রবীণদের সম্পত্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুগান্তকারী আইন: সম্পত্তি দান করেও রাখা যাবে আজীবন ভোগদখলের অধিকার
বিশেষ প্রতিবেদক| ৩১ আগস্ট, ২০২৬
বাংলাদেশের প্রবীণ নাগরিকদের সম্পত্তিগত নিরাপত্তা ও পারিবারিক সুরক্ষায় যুক্ত হলো এক নতুন আইনি মাত্রা। দান বা হেবা করে দেওয়ার পর অনেক বয়োবৃদ্ধ বাবা-মা বা দাদা-দাদি নিজ বসতভিটা থেকেই উচ্ছেদ হওয়া কিংবা আর্থিক অনাদরে দিন কাটানোর যে ঝুঁকিতে থাকতেন, সেই সামাজিক ব্যাধি রোধে আইনি ধারায় আনা হয়েছে ঐতিহাসিক পরিবর্তন।

‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট, ১৮৮২’ (Transfer of Property Act, 1882) সংশোধন করে নতুন **১২২এ** এবং **১২২বি** ধারা সংযোজন করা হয়েছে। নতুন এই সংশোধনের ফলে বাবা-মা বা দাদা-দাদি/নানা-নানি তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সন্তান বা নাতি-নাতনিকে দান (Gift) করলেও নিজেদের জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তির পূর্ণ ভোগদখল ও সুবিধা গ্রহণের অধিকার নিজেদের কাছে সংরক্ষণ করতে পারবেন।
নতুন আইনের মূল দিকসমূহ
আজীবন ভোগদখলের অধিকার:** সম্পত্তি রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে হস্তান্তর হয়ে গেলেও দাতা যতদিন জীবিত থাকবেন, ততদিন তিনি ওই সম্পত্তিতে বসবাস বা তা থেকে আয়-উপার্জনের (যেমন: বাড়ি ভাড়া বা কৃষিজমির ফসল) অধিকার ভোগ করবেন। গ্রহীতা দাতার জীবদ্দশায় তাকে উচ্ছেদ করতে পারবে না।
দলিল বাতিল ও পরিবর্তনের নিয়ম: দলিলের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়ার পর এ ধরনের দান সাধারণভাবে অপরিবর্তনীয় বা বাতিল অযোগ্য হবে। তবে নিম্নোক্ত উপায়ে এটি পরিবর্তন বা বাতিল করা যাবে:
১. দানকারী ও গ্রহীতা—উভয় পক্ষের পারস্পরিক সম্মতিতে একটি নিবন্ধিত (Registered) দলিলের মাধ্যমে।
২. নির্ধারিত আইনগত ক্ষেত্রে বা জটিলতায় জেলা জজের (District Judge) পূর্বানুমতি সাপেক্ষে।
সামাজিক প্রেক্ষাপট ও আইনি গুরুত্ব
আমাদের সমাজে অনেক প্রবীণ অভিভাবক জীবনের শেষ সম্বলটুকু আবেগবশত সন্তান বা নাতি-নাতনিদের নামে লিখে দিয়ে পরবর্তীতে অসহায় হয়ে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে সম্পত্তি পাওয়ার পরপরই গ্রহীতারা বয়োবৃদ্ধ অভিভাবকদের ভরণপোষণ বন্ধ করে দেয়, এমনকি বসতবাড়ি থেকেও বের করে দেওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
নতুন সংযোজিত ১২২এ ও ১২২বি ধারা প্রবীণদের সেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনবে। এটি কেবল আইনি সুরক্ষা নয়, বরং পারিবারিক মেলবন্ধন টিকিয়ে রাখতে এবং প্রবীণদের আত্মমর্যাদা রক্ষায় একটি শক্তিশালী প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে।
“প্রবীণদের সম্পত্তিগত নিরাপত্তা ও পারিবারিক সুরক্ষায় এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী আইনগত অগ্রগতি। দীর্ঘদিন ধরে অনেক বয়োবৃদ্ধ অভিভাবক দানপত্রের পর নিজেদের অধিকার হারিয়ে অসহায় জীবনযাপন করছিলেন। নতুন এই ধারার ফলে একদিকে যেমন সম্পদের মালিকানা হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া সহজ থাকবে, অন্যদিকে দাতার সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিশ্চিত হবে।

অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আইন প্রণয়নের ফলে দেশে বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র বা বৃদ্ধাশ্রমে প্রবীণদের জোরপূর্বক পাঠানোর প্রবণতা হ্রাস পাবে। একইসাথে, সম্পত্তির লোভে কোনো ধরনের প্রতারণামূলক দলিল তৈরি প্রতিরোধে এবং প্রবীণদের প্রতি পারিবারিক জাবাবদিহিতা বাড়াতে এই নতুন বিধান কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
আইনটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মাঝে তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা গেলে এর সুফল প্রতিটি পরিবারে পৌঁছানো সম্ভব হবে।