নাজমুল হাসান, স্টাফ রিপোর্টার | সাভার
সাভার উপজেলার ভাগুতা ও মুগদা কান্দা এলাকা এখন এক বিভীষিকার নাম। প্রতিদিন সূর্যাস্তের পর থেকে শুরু হয় এক বিভীষিকাময় কর্মযজ্ঞ। স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের হোতা আলম-এর ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা ১০টি অবৈধ টায়ার পোড়ানো কারখানা থেকে বের হওয়া বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় মাইলের পর মাইল এলাকা। এই ধোঁয়ায় মানুষের নিশ্বাস নেওয়া দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে, ধ্বংস হচ্ছে কৃষকের শেষ সম্বল ফসলি জমি এবং মারা যাচ্ছে গৃহপালিত পশুপাখি।
আলমের ‘বিষ সাম্রাজ্য’: আইন যেখানে অচল
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাভারের এই জনপদে সরকারি কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই মালিক আলম গড়ে তুলেছেন এই মরণফাঁদ। টায়ার পুড়িয়ে ফার্নেস অয়েল উৎপাদনের এই প্রক্রিয়ায় কোনো আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা ইটিপি (ETP) নেই। অত্যন্ত নিম্নমানের চিমনী ব্যবহার করায় ভারী রাসায়নিক মিশ্রিত ধোঁয়া সরাসরি বাতাসে মিশছে। স্থানীয়রা জানান, আলমের প্রভাব এতই বেশি যে, তার কারখানার বিরুদ্ধে কেউ টু শব্দ করলে তাকে নানাভাবে হয়রানি ও হুমকি দেওয়া হয়। এ কারণে ভয়ে এলাকার মানুষ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পায় না।
বিপর্যস্ত কৃষি ও মরণব্যাধির হাতছানি
কৃষিনির্ভর এই এলাকায় এখন হাহাকার। কৃষকদের অভিযোগের পাহাড় জমলেও দেখার কেউ নেই।
ফসল হানি: ধোঁয়ার সাথে মিশে থাকা বিষাক্ত কণা ফসলের ওপর কালচে আস্তরণ তৈরি করছে, যার ফলে ধান ও শাকসবজি পুড়ে যাচ্ছে।
প্রাণহানি: একাধিক কৃষক অভিযোগ করেছেন, মাঠের ঘাস খেয়ে গবাদি পশু অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এমনকি গত কয়েক সপ্তাহে বেশ কিছু হাঁস-মুরগি মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি: স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টায়ার পোড়ালে বাতাসে ‘ডাইঅক্সিন’ ও ‘ফিউরান’ নামক অত্যন্ত ক্ষতিকর গ্যাস ছড়ায় যা সরাসরি ফুসফুসের ক্যান্সার, জন্মগত ত্রুটি এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এলাকার শিশুদের মধ্যে ইতোমধ্যে শ্বাসকষ্ট ও চর্মরোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে।
মালিক আলমের ধোঁয়াশাপূর্ণ ভূমিকা
অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি কথা বলতে এই প্রতিবেদক কারখানা চত্বরে গেলে মালিক আলমকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে দেখা যায় তার নম্বরটি বন্ধ। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের অভিযানের গুঞ্জন শুনলে আলম কৌশলে কারখানা বন্ধ রাখেন এবং পরিস্থিতি শান্ত হলে পুনরায় রাতের অন্ধকারে উৎপাদন শুরু করেন। এলাকার মানুষের প্রশ্ন—কার খুঁটির জোরে আলম এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন?
আইনের কাঠগড়ায় শাস্তির কঠোর বার্তা
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের কারখানা স্থাপন করা দণ্ডনীয় অপরাধ। আলমের বিরুদ্ধে যেসব আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব:
কারাদণ্ড: পরিবেশগত ক্ষতি করার দায়ে তাকে সর্বনিম্ন ২ থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া যেতে পারে।
জরিমানা: পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতি করায় তাকে ১০ লক্ষ টাকা বা তার বেশি জরিমানা করার বিধান রয়েছে।
উচ্ছেদ ও বাজেয়াপ্ত: ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক কারখানা সিলগালা এবং কাঁচামাল বাজেয়াপ্ত করার স্পষ্ট আইন রয়েছে।
প্রশাসনের শেষ বার্তা
এ প্রসঙ্গে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন,
“আলম হোক বা অন্য কেউ, অবৈধভাবে পরিবেশ দূষণকারী কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। ভাগুতা ও মুগদা কান্দার এই ১০টি কারখানার বিষয়ে আমরা অবগত হয়েছি। দ্রুত একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে অবৈধ এই স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে এবং অভিযুক্ত মালিক আলমের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হবে।”
এলাকাবাসীর দাবি, এবার শুধু আশ্বাস নয়, আলমের এই বিষাক্ত কারখানার চাকা যেন চিরতরে বন্ধ হয়। তারা বুক ভরে স্বস্তির নিশ্বাস নিতে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।