দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
তারিখ: ৪ আগস্ট ২০২৫ | মঙ্গলবার
স্লোগান: জনতার কণ্ঠস্বর
র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা আলেপ উদ্দিনের লালসার শিকার: চোখের পানি চেপে রাখা যাবে না, রাষ্ট্রীয় ধর্ষণ ও গুমের ভয়াবহ দলিল প্রকাশ্যে
নিজস্ব প্রতিবেদক:
আওয়ামী আমলে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিকৃত রুচির পৈশাচিকতা কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার এক মর্মান্তিক চিত্র উঠে এসেছে সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেনের ফেসবুক পোস্টে। সেখানে একটি নির্যাতিত পরিবারের আত্মকথনের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে এসেছে সাবেক র্যাব কর্মকর্তা ও বরখাস্ত হওয়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) আলেপ উদ্দিনের ভয়ংকর নির্যাতন ও ধর্ষণের বর্ণনা।
২০১৫ সালের ৩০ মে। সকাল ১১টা। বনশ্রীর নিজ বাসা থেকে অফিসে যাওয়ার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ভুল ব্যক্তি ভেবে আটকের পর টানা ২৩-২৪ দিনের রিমান্ড ও অকথ্য নির্যাতন চালানো হয় তার ওপর। আটদিন তাকে ঘুমাতে দেওয়া হয়নি। ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নিতে বাধ্য করা হয়, যেখানে সাজানো গল্পে উল্লেখ ছিল, তিনি গ্যারেজ থেকে বোমা-ছুরি হাতে ধরা পড়েছেন। অথচ তিনি স্পষ্ট জানান, সত্যিই ভুল ধরে নিয়ে নির্যাতন চালানো হয়।
এই ভুল গ্রেপ্তার ছিল তার জীবনের শুরু। এরপর শুরু হয় এক ভয়াবহ অধ্যায়।
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবার র্যাব সদস্যরা খোঁজ করতে আসে। তাকে না পেয়ে স্ত্রী ও শ্যালককে ধরে নিয়ে যায় র্যাব-১১। তিন দিন আটকে রাখে। স্ত্রীকে রাখা হয় এক সেলে, যেখানে দেয়ালের ওপরে নেই কোনো প্রাইভেসি, সিসিটিভি ক্যামেরার নিচে তাকে টানা ৩ দিন ঘুমাতে দেওয়া হয়নি। তাকে ‘জঙ্গির বউ’ বলে গালাগাল করে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে স্বামী আত্মসমর্পণ করলে তাকে আবারও জেলে পাঠানো হয়। এরপর আলেপ উদ্দিন নামে র্যাবের ওই কর্মকর্তা শুরু করে তার মূল অপরাধ।
আলেপ ওই তরুণের স্ত্রীকে ডেকে নেয় একাধিকবার। কখনো বলে, “স্বামীকে বের করতে চাইলে দেখা করতে হবে,” কখনো বলে “আপনার সঙ্গে ব্যক্তিগত কিছু কথা আছে”। প্রথমে বাসায় গিয়ে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে। পরে একদিন নিজ অফিস থেকে সাদা গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় র্যাব কোয়ার্টারে। সেখানে তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়। প্রথমবার ঘটনা চেপে গিয়েছিলেন স্ত্রী, কিন্তু পরে অসুস্থতা, বিষণ্নতা, অবসাদে ভেঙে পড়ায় সব খুলে বলেন।
স্বামী বলেন, “আমার স্ত্রী দিনের পর দিন শুধু কাঁদত। রাতে মোনাজাতে ফ্লোরে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদত। সে আমাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত। অথচ এক বিকৃত মস্তিষ্কের পিশাচ তার সবকিছু ছিঁড়ে নিয়েছে।”
আলেপের বিরুদ্ধে একাধিক নারীকে ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ, ধর্ষণের আগে রোজা ভাঙানো, গুম, ইলেকট্রিক শক, চোখ বেঁধে ঝুলিয়ে নির্যাতনসহ অর্ধশতাধিক অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জমা পড়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, “আলেপ উদ্দিন শুধু ধর্ষকই নয়, সে রোজার মাসে রোজা ভাঙিয়ে ধর্ষণ করেছে। স্বামীকে হত্যা করার হুমকি দিয়ে স্ত্রীকে ধর্ষণ করেছে। চোখে চোখ রাখলে বোঝা যায়, এই মানুষটি মনুষ্যত্ব হারিয়েছে।”
তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো বিচার হয়নি। এখনো অনেক নির্যাতিত পরিবার মামলা করতে ভয় পায়। কেউ কেউ মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন। ভেঙে পড়েছে সংসার, ধ্বংস হয়েছে জীবন।
তীব্র নিন্দা ও বিচার দাবি
এই ভয়াবহ ঘটনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন মানবাধিকার সংগঠনগুলো। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতির অবসান চেয়েছেন তারা। ভুক্তভোগীর পরিবার স্পষ্ট বলেছে, “আলেপ উদ্দিন ছিল না হলে আমরা আজ এমন জাহান্নামে পড়তাম না।”
আমরা চাই—আলেপ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে রাষ্ট্রীয় ট্রাইব্যুনালে বিচার হোক। এই বর্বরতা জাতি ভুলবে না, ভুললে চলবে না।
আমিন—আল্লাহ যেন দুনিয়া ও আখিরাতে এই বর্বরদের শান্তি না দেন।