মৃত নারীর শেষ সম্বলও গিলে খেলেন এসআই জাহাঙ্গীর: বগুড়ায় পুলিশের বিরুদ্ধে অর্থ ও স্বর্ণ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া বগুড়ায় এক নিঃস্ব ও সহায়-সম্বলহীন নারীর মৃত্যুর পর তার ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া শেষ সম্বলটুকুও আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। মানবিকতার চরম অবক্ষয় ঘটিয়ে মৃত সাবিকুন নাহারের ঘর থেকে পাওয়া নগদ ২০ হাজার টাকা ও চার আনা স্বর্ণালঙ্কার স্বজনদের না দিয়ে নিজের পকেটে ভরেছেন বলে অভিযুক্ত হয়েছেন বগুড়া সদর থানার স্টেডিয়াম পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত উপ-পরিদর্শক (এসআই) জাহাঙ্গীর আলম। এই ঘটনায় থানা ও আদালতের নথিপত্রে ভয়াবহ জালিয়াতি ও তথ্যের গরমিল পাওয়া গেছে, যা পুরো পুলিশ প্রশাসনের ভাবমূর্তিকে সংকটের মুখে ফেলেছে।
ঘটনার আদ্যোপান্ত অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৬ ডিসেম্বর বগুড়া শহরের জামিল নগর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় সাবিকুন নাহার নামের এক নারী মারা যান। খবর পেয়ে স্টেডিয়াম ফাঁড়ির এসআই জাহাঙ্গীর আলম ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন। স্থানীয়দের উপস্থিতিতে ঘর তল্লাশি চালিয়ে তিনি সেখান থেকে নগদ ২০ হাজার টাকা এবং আনুমানিক চার আনা ওজনের স্বর্ণালঙ্কার জব্দ করেন। প্রত্যক্ষদর্শী বাড়ির মালিক শাজাহান আলী ও তার স্ত্রী শামিমা বেগম জানান, তাদের সামনেই টাকা ও স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু রহস্যজনকভাবে এসআই জাহাঙ্গীর কোনো জব্দ তালিকা (সিজার লিস্ট) তৈরি করেননি এবং উপস্থিত কারও স্বাক্ষরও নেননি। আইন অনুযায়ী, যে কোনো মালামাল উদ্ধারের সময় জব্দ তালিকা তৈরি করা বাধ্যতামূলক, যা তিনি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন।
নথিপত্রে ভয়াবহ জালিয়াতি অভিযোগের মুখে এসআই জাহাঙ্গীর আলম দাবি করেন যে, তিনি উদ্ধারকৃত মালামাল যথাযথ প্রক্রিয়ায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে আদালতে জমা দিয়েছেন। কিন্তু তার এই দাবির কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। বগুড়া সদর থানার রেকর্ড অনুযায়ী, ওই দিন রাত ১১টা ২৫ মিনিটে একটি জিডি (নং ৫৫৭) করা হয়, যাতে কেবল ‘অপমৃত্যু মামলা’র কথা উল্লেখ রয়েছে। সেই জিডির কোথাও টাকা বা স্বর্ণ উদ্ধারের বিষয়ে একটি শব্দও লেখা নেই। অন্যদিকে, বগুড়া আদালতের জেনারেল রেকর্ড অফিসার (জিআরও) সুশান্ত কুমার স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, এসআই জাহাঙ্গীর আলম আদালত বা মালখানায় কোনো টাকা কিংবা স্বর্ণ জমা দেননি। অর্থাৎ, উদ্ধারকৃত মালামালগুলো নথিপত্র থেকে সম্পূর্ণ গায়েব করে দেওয়া হয়েছে।
দাফনের টাকা দাবি ও অমানবিকতা ঘটনার অমানবিকতা এখানেই শেষ নয়। বাড়ির মালিক দম্পতি অভিযোগ করেছেন, লাশ উদ্ধারের দুই দিন পর এসআই জাহাঙ্গীর তাদের ফাঁড়িতে ডেকে পাঠান। তিনি তাদের বলেন, উদ্ধারকৃত ২০ হাজার টাকা থেকে তাকে ১০ হাজার টাকা দিলে তবেই তিনি লাশ দাফনের ব্যবস্থা করবেন। এমন অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তিনি দাফনের দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান। পরবর্তীতে কোনো স্বজন বা পুলিশি সহায়তা না পেয়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম ওই নারীর দাফন সম্পন্ন করে। একজন মৃত ব্যক্তির শেষ কৃত্যানুষ্ঠান নিয়েও পুলিশের এমন বাণিজ্যের খবরে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
এসআই জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এসআই জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার আরও অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য। গত ২০ ডিসেম্বর রাতে স্টেডিয়াম ফাঁড়ির এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মোছাঃ আলো বেগম নামে এক নারী অভিযোগ করেন যে, কোনো প্রমাণ ছাড়াই তার স্বামীর মিথ্যা অভিযোগে পুলিশ তাকে এবং তার কন্যাকে ঘর থেকে জোরপূর্বক বের করে দেয়। পুলিশের ক্রমাগত হুমকিতে ওই নারী ও তার সন্তান আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত পর্যন্ত নিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের মতে, এসআই জাহাঙ্গীর ও ফাঁড়ির কতিপয় অসাধু চক্র সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।
জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া বগুড়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এরশাদুল বারী এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মৃত ব্যক্তির সম্পদ চুরির অভিযোগ আসাটা লজ্জাজনক। এটি বাহিনীর সৎ কর্মকর্তাদের মাথা নিচু করে দিচ্ছে। স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা অবিলম্বে এসআই জাহাঙ্গীর আলমকে ক্লোজ করে বিভাগীয় তদন্ত শুরু করার দাবি জানিয়েছেন।
শেষ কথা একজন মৃত নারীর শেষ চিহ্নটুকু নিয়ে যে লুকোচুরি খেলা হয়েছে, তা এখন টক অফ দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে। যদি টাকা ও স্বর্ণ আদালতেই জমা দেওয়া হয়ে থাকে, তবে নথিতে কেন তার প্রমাণ নেই—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছেন না অভিযুক্ত কর্মকর্তা। পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, তবে সাধারণ মানুষের দাবি, এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার না হলে আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা চিরতরে হারিয়ে যাবে। এই প্রতিবেদক পুরো বিষয়টি নিয়ে আরও গভীরে অনুসন্ধান চালিয়ে য