বাংলাদেশ বেতারের ভেতরে ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মা — শেখ মুজিবের ব্রোঞ্জ ভেঙে কোটি টাকা আত্মসাৎের অভিযোগ
বিশেষ প্রতিবেদক | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
বাংলাদেশ বেতার—যে প্রতিষ্ঠানটি মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা ও স্বাধীনতা-চেতনার এক সময়ের অম্লান কণ্ঠ ছিল—আজ সেখানে উঠেছে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমাদের কাছে দাখিল করা অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ সূত্রের ভিত্তিতে তদন্তে উঠে এসেছে মর্মান্তিক ও নিন্দনীয় চিত্র, যা জাতীয় patrimoni ও সরকারি সম্পদের সুরক্ষার প্রশ্ন তোলে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক (ডিজি) এ এস এম জাহিদ। অভিযোগগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য — শেখ মুজিবুর রহমানের ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য ভাঙার আড়ালে ব্রোঞ্জ উপকরণ লোপাট, নিয়োগ-ঘুষ, সরকারি সম্পদ বিক্রি করে ব্যক্তিগত হালসামৃদ্ধি, এবং সরকারি আবাসিক এলাকা ভাঙচুর করে অবৈধভাবে পশুর হাট বসিয়ে কোটি টাকার লেনদেন।
নীচে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আকারে অভিযোগ, প্রাপ্ত প্রমাণসংকেত ও সাংবাদিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো — পাঠকদের জন্য স্পষ্ট করে দেয়া যাচ্ছে যে এগুলো অভিযোগভিত্তিক এবং কার্যকর তদন্ত ছাড়া দায়সূত্র প্রমাণিত নয়।

সংক্ষিপ্ত সারমর্ম (Lead)
অনেকে মনে করেন — একটি পরিকল্পিত নাটকের আড়ালে বাংলাদেশ বেতারের রাষ্ট্রীয় সম্পদ সংরক্ষণ ও পরিচালনায় অনিয়ম করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, শেখ মুজিবুর রহমানের ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য ভাঙার নাটক সাজিয়ে তা পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে; পাশাপাশি নিয়োগ-ঘুষ ও সরকারি সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়েছে।
—
১) ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য: ভাঙা, অনুপস্থিতি ও প্রশ্নোত্তর
শেরেবাংলা নগরের বেতারের মূল ফটকের সামনে স্থাপিত আওয়ামী লীগের জাতির পিতার ওই বিশাল ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য প্রকল্পের মোট ব্যয় ছিল—প্রকল্প দল ও নথিপত্র অনুযায়ী—প্রায় কোটি টাকার সার্কিটে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে অজুহাত দেখিয়ে ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলা হয়।
পরবর্তী রাতে মূর্তির কয়েকশ কেজি (অভিযোগে বলা হয় প্রায় এক হাজার কেজি পর্যন্ত) রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যায়; কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে অনেক অংশ সংরক্ষিত আছে, কিন্তু অবশিষ্টাংশের সপক্ষে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি—এটি অনুসন্ধানের একটি বড় ফাঁক হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরা অচল রাখা হয়েছিল, ফলে ঘটনার চক্রবৃদ্ধ প্রমাণ নষ্ট বা লোপাট করা সহজ হয়েছে।

১) প্রতিবেদনে এই বিষয়ের তথ্য-সূত্র স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাওয়া গেছে—তবে এসব অভিযোগ এখনও বিষয়াভিত্তিক তদন্তে যাচাইযোগ্য নয়,অভিযুক্ত কারীর বক্তব্য নেয়া হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।
২) নিয়োগ-ঘুষ ও স্বজনপ্রীতি
একাধিক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমাদেরকে জানিয়েছেন যে ২০২২ সালে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৪৬ জন শিল্পীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে—অডিশন বা প্রকাশ্য প্রতিযোগিতা ছাড়াই।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রত্যেককে ৫-৭ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়েছে; অনেক ক্ষেত্রেই নগদ লেনদেন হয়েছে, এবং অভিযোগ আছে—কিছু টাকা সাবেক কিছু কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টেও জমা পড়েছে।
এ ধাঁচের নিয়োগ-ঘুষ ও স্বজনপ্রীতির ফলে অনেক যোগ্য শিল্পী ও কর্মকর্তাদের ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে; উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সুরক্ষা ও প্রভাব থাকার কারণে অনেকে প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছেন না বলেও জানানো হয়েছে।
৩) সরকারি সম্পদ বিক্রি ও স্ক্র্যাপ নথিভুতি না থাকা
বেতারের পুরনো গাড়ি, যন্ত্রাংশ ও মূল্যবান সরঞ্জাম ব্যাকডেট টেন্ডার দেখিয়ে স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সূত্র বলছে, কাগজে অনেক গাড়ি ও যন্ত্রাংশ অকেজো হিসেব দেখানো হলেও বাস্তবে অনেকগুলো বাংলা-চালনাযোগ্য ছিল — ফলে সরকারি সম্পদ নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করা হয়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ন্যূনতম ৮–১০টি গাড়ি এভাবে বিক্রি করা হয়েছে, যার বাজারমূল্য ছিল কোটি টাকারও বেশি।
৪) সরকারি জমি/আবাসিক এলাকা ভেঙে অবৈধ হাট ও লেনদেন
সাভারের রেডিও কলোনি এলাকায় সরকারি আবাসিক নিরাপত্তা অঞ্চল ভেঙে অবৈধ কোরবানি পশুর হাট বসানোর অভিযোগ এসেছে। অভিযোগকারীরা বলেছেন, ইজারাদারদের সুবিধা করে বিপুল অঙ্কের অর্থ উপার্জন করা হয়েছিল। ঢাকা জেলা প্রশাসনের পদক্ষেপে হাটটি পরে উচ্ছেদ করা হলেও ততক্ষণে বহুত কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে।
৫) আর্থিক অস্বাভাবিকতা ও সন্দেহজনক লেনদেন
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—বিভিন্ন সূত্রে ইঙ্গিত আছে যে কিছু ব্যক্তির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পর্যায়ে অর্থ জমা পড়েছে ও বারবার নগদ উত্তোলন দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন সরকারি বেতনের উৎস থেকে এ ধরনের সঞ্চয় করা বাস্তবে অসম্ভব হলেও এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে কেবলই ব্যাংক লেনদেন শনাক্তকরণ ও ফরেনসিক অডিট দিয়ে।
৬) যাদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে (সংক্ষিপ্ত)
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন শিল্পী ও কর্মকর্তার বয়ান।
কিছু প্রাইভেট দলিল ও অভ্যন্তরীণ নথির আংশিক কপি (যা আমাদের কাছে যাচাইযোগ্য সূত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে)।
(দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ এই নথি যাচাই করে দেখেছে, তবে এ রিপোর্টে সব কপি সংখ্যাসহ প্রকাশ করা হচ্ছে না—আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে)।
৭) প্রশাসনিক স্বরূপ ও রাজনৈতিক প্রভাব
অভিযুক্ত ব্যক্তি যে উচ্চপদস্থ হওয়ার কারণে—সূত্র বলছে—তাঁর রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা কিছু সময় প্রশাসনিক উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করেছে। অভিযোগকারীরা উল্লেখ করেছেন যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উচ্চকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে দরকারি তদন্ত থেমে গিয়েছে বা দমন করা হয়েছে।
৮) সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও হক-টু-রিপ্লাই
রিপোর্ট তৈরীর সময় দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ বিষয়টি নিশ্চিত এবং প্রতিপক্ষীয় বক্তব্য নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মহলকে বারংবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছে। তবে শেষ সময়ে পর্যন্ত (রিপোর্ট প্রেসে পাঠানোর আগ পর্যন্ত) ডিজি তথা অভিযুক্তের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি / রিপোর্টে যুক্ত করা হয়নি। (প্রাপ্ত হলে সম্পূর্ণ বক্তব্য প্রতিবেদন আপডেটে যুক্ত করা হবে।

ঘোষণা: আমরা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপরাধপ্রমাণ হিসেবে এ রিপোর্টে উল্লেখিত তথ্যকে চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন করছি, এগুলো অভিযোগভিত্তিক এবং প্রমাণ সংগ্রহ ও স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন — যা আদালত, দুদক বা ন্যায্য তদারকি কমিটির মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
৯) দাবী ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা (পরামর্শমূলক)
বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের সুপারিশের আলোকে আমরা নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো জরুরি মনে করছি — যাতে দ্রুত, স্বচ্ছ ও আইনি প্রক্রিয়ায় সত্য উদঘাটিত হয়:
1. তাত্ক্ষণিকভাবে ডিজিকে (অভিযুক্ত ব্যক্তিকে) সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের সুযোগ করে দেয়া।
2. স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা — যাতে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, দুর্নীতি প্রতিরোধী সংস্থা (যেমন দুদক/ACC), হিসাব-নিরীক্ষা ও সাংবাদিক/নাগরিক সমাজ প্রতিনিধিরা থাকেন।
3. ব্রোঞ্জ লোপাট, সরবরাহ-নথি, টেন্ডার নথি ও নিয়োগ সম্পর্কিত সব জরুরি নথি জব্দ করে ফরেনসিক অডিট করা।
4. যেসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে—তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা এবং প্রয়োজন হলে সাময়িক নির্বাসন।
5. বেতারের আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের হিসাব-নিকাশে ডিজিটাল অডিট ও স্বচ্ছতা বিধান বাধ্যতামূলক করা।
6. নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্থ শিল্পী ও কর্মচারীদের ক্ষতিপূরণ ও পুনঃমূল্যায়নের ব্যবস্থা করা।
—
১০) নিয়মানুযায়ী সাবধানতা (লিগ্যাল নোট)
এই প্রতিবেদনটি অভিযোগভিত্তিক অনুসন্ধানী রিপোর্ট; এবে কোনও সিদ্ধান্তমূলক দায়িত্বারোপ করা হয়নি।
যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা বা শাস্তির অধিকার সর্বশেষ আদালত/নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশে নির্ধারিত হবে।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ গুরুতর অভিযোগ নথিভুক্ত ও প্রকাশের সময় সর্বদা আইনি ও সাংবাদিক নীতিমালা মেনে চলে; ন্যায্যতা ও প্রমাণের ভিত্তিতে যথাযোগ্য ভাবে প্রতিবেদন আপডেট করা হবে।
শেষ কথা (কল-টু-অ্যাকশন)
বাংলাদেশ বেতার জাতির সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অংশ। সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি, নিয়োগ-ঘুষ ও সম্পদ লোপাট কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, দেশের সামগ্রিক সুশাসন ও সংগঠনের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। তাই—সরকারি কর্তৃপক্ষ ও তদন্ত সংস্থাগুলোকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও জোরালোভাবে এগিয়ে এসে এই অভিযোগগুলোর স্বাধীনতাপূর্ণ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা দেশের আইনের শাসন ও ন্যায্যতার জন্য অপরিহার্য।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ — অনুসন্ধানী কর্মীরা ইতিমধ্যেই অভিযোগকারীদের বর্ণনা, নথি ও প্রাথমিক প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন; বর্তমান রিপোর্টে উল্লিখিত বিবরণ অনুসারী তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই-বাছাইয়ের অপেক্ষায়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মন্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সংস্করণে যুক্ত করা হবে।