তারিখ ও সময়: ৭ আগস্ট ২০২৫, রাত ১০:৩৫
প্রতিবেদক: জনতার কণ্ঠস্বর ডেস্ক
গাজীপুরে সাংবাদিক হত্যাকে কেন্দ্র করে ‘নতুন বাংলাদেশে’ পুরনো মিডিয়া ট্রায়ালের ছায়া—বিএনপিকে জড়িয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারে নিন্দা ও প্রশ্ন
গাজীপুর প্রতিনিধি – আজ ৭ আগস্ট রাতে গাজীপুর মহানগরের ব্যস্ত চান্দনা চৌরাস্তায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে সাংবাদিক মো. আসাদুজ্জামান তুহিনকে। প্রকাশ্যে এই গলা কেটে হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে শোক ও ক্ষোভ তৈরি করলেও ঘটনার প্রকৃত তদন্তের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে বিএনপিকে দায়ী করে বিভ্রান্তিকর প্রচার—যা অনেকের চোখে সেই পুরনো ‘হাসিনা আমলের মিডিয়া ট্রায়াল’-এর পুনরাবৃত্তি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে, একটি নবগঠিত রাজনৈতিক দলের কিছু নতুন মুখ এই ঘটনার সঙ্গে বিএনপিকে জড়িয়ে মন্তব্য দিয়েছেন, অভিযোগ করেছেন—এই হত্যার নেপথ্যে নাকি বিএনপিপন্থীরা জড়িত। কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাখ্যা: সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ নিশ্চিতভাবে জানতে পেরেছে যে গাজীপুরের একাধিক দায়িত্বশীল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়েছে। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—এটি রাজনৈতিক কোনো হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এটি একটি ‘ট্র্যাপ-ভিত্তিক সন্ত্রাসী হামলা’।
সূত্র জানায়, মূল ঘটনার সূত্রপাত হয় একজন নারী ও একজন পুরুষের মধ্যে, যেখানে সন্দেহ করা হচ্ছে—ওই নারী পরিকল্পিতভাবে ওই পুরুষকে ‘হ্যানিট্র্যাপ’-এ ফেলেছিলেন, তার অর্থসম্পদ ও তথ্য হাতিয়ে নিতে। কিন্তু পুরুষটি প্রতারণা বুঝতে পেরে প্রতিবাদ করলে তা তর্ক-বিতর্কে রূপ নেয়। তখনই আশপাশে ওঁৎ পেতে থাকা একটি সঙ্ঘবদ্ধ সন্ত্রাসী চক্র অতর্কিতে হামলা চালায়।
এ সময় উপস্থিত সাংবাদিক মো. আসাদুজ্জামান তুহিন তার মোবাইলে ভিডিও ধারণ করতে গেলে দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে তেড়ে এসে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে।
সরাসরি বিএনপি জড়িত নয়—জানায় নিরাপত্তা বাহিনী
সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা জানিয়েছেন, ঘটনায় বিএনপি বা তাদের কোনো অঙ্গসংগঠনের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলেনি। ঘটনাটি চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা নির্বাচনী সহিংসতার অন্তর্ভুক্ত নয় বলেও তারা নিশ্চিত করেছেন। স্রেফ একটি প্রেম-প্রতারণার ফাঁদ এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সন্ত্রাসীর কার্যক্রম বলেই প্রাথমিকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এখনো পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা না গেলেও মূল অভিযুক্ত হিসেবে ধরা হচ্ছে ওই নারীকে। তাকে গ্রেফতার করলেই পুরো চিত্র পরিষ্কার হয়ে যাবে বলে মনে করছে পুলিশ।
“জানলে প্রমাণ দাও”—সার্জিসের দাবিকে কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিক্রিয়া
নতুন দলের এক নেতা সার্জিস এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে স্ট্যাটাস দিয়ে দাবি করেছেন যে—বিএনপিপন্থীরা জড়িত। অথচ তিনি কীভাবে এই দাবি করলেন, কার নির্দেশে করলেন, সেটি স্পষ্ট নয়। বরং তার ভাষ্য অনুযায়ী—তিনি যদি জেনেই থাকেন এই হত্যাকাণ্ডে বিএনপি জড়িত, তবে তদন্তের স্বার্থে তার কাছ থেকেই তথ্য আদায় করা জরুরি।
এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা—“যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চিত যে বিএনপি এই ঘটনায় জড়িত নয়, তখন একজন সাধারণ রাজনীতিক কীভাবে আগেভাগেই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলেন? আর যদি সত্যিই বিস্তারিত জানেন, তাহলে তা গোপন না রেখে রাষ্ট্রকে জানান।”
“নতুন বাংলাদেশে পুরনো চর্চার পুনরাবৃত্তি?”
বিএনপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং দায়বদ্ধতার প্রসঙ্গে বলা হয়, এই দলই একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি যারা নিজেরা সাংগঠনিকভাবে অসদাচরণকারী হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে, এমনকি থানায় অভিযোগ পর্যন্ত করেছে। অন্যদিকে, অন্যান্য দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে—তারা নিজেদের লোকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়েই উল্টো বিরোধীদের দোষারোপ করে আসছে, এমন অভিযোগ রয়েছে।
অতীতে শেখ হাসিনার শাসনামলে দেখা গেছে—যখনই বড় কোনো দুর্ঘটনা, সহিংসতা বা অপরাধ ঘটেছে, তখন তদন্তের আগেই বিএনপিকে দায়ী করে প্রচার চালানো হতো, যাতে বিচার প্রক্রিয়া প্রভাবিত হতো, এবং জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানো যেত।
দোষারোপ নয়, চাই নিরপেক্ষ তদন্ত
গাজীপুরে একজন সাহসী সাংবাদিকের জীবন চলে গেছে, নৃশংসভাবে, প্রকাশ্যে। এই সময়টি হওয়া উচিত ছিল শোক, বিচারের দাবি ও দ্রুত অপরাধী শনাক্তের প্রতি সকলের একসাথে অবস্থান নেওয়ার। অথচ কিছু রাজনীতিক, যারা নিজেকে ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর কণ্ঠস্বরে পরিণত করতে চাইছেন, তারাই পুরনো রাজনৈতিক অপপ্রচারের অস্ত্র নিয়ে নেমেছেন।
এই ঘটনায় প্রকৃত অপরাধী যেই হোক, তাকে খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক—সেটিই এখন দেশের মানুষের প্রত্যাশা।