গোদাগাড়ীর মাদক স্পট থেকে ৩০ লাখ টাকা মাসোহারা নেন ডিএনসির রায়হান: অভিযোগে তোলপাড় রাজশাহী
স্টাফ রিপোর্টার | ডেইলি বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
রাজশাহী, ২৮ জুলাই ২০২৫ — মাদকবিরোধী ভিশন আর মিশনের কথা বলে রাজশাহীতে দৃশ্যমান কোনও সফলতা দেখাতে না পারলেও, গোদাগাড়ী উপজেলায় নিয়োজিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) পরিদর্শক রায়হান আহমেদ খান একাধিক গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তিনি প্রতি মাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকা মাসোহারা উত্তোলন করছেন বিভিন্ন মাদক স্পট থেকে।
মাদক নিয়ন্ত্রণের মূল দায়িত্বে থাকা সংস্থা ডিএনসি যখন দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানোর দাবি করছে, তখন রাজশাহীর গোদাগাড়ী, চারঘাট ও বাঘা সীমান্ত দিয়ে প্রতিনিয়ত ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ মাদক প্রবেশ করছে। অথচ, এসব এলাকার গডফাদারদের ধরার চেয়ে সাধারণ সেবনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়াতেই ব্যস্ত পরিদর্শক রায়হান।
রাজনীতিক প্রতিপক্ষ টার্গেট, মামলা বাণিজ্য ও মাসোহারা সিন্ডিকেট
ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, রায়হান আহমেদ খান ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ তারিখে পরিদর্শক হিসেবে রাজশাহীতে যোগদান করেন। তারপর থেকেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে থাকে—বিরোধী রাজনৈতিক মতাবলম্বীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো, মামলা বাণিজ্য এবং মাসোহারা আদায়ের মতো গুরুতর অনিয়মের।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তিনি প্রতিমাসে গোদাগাড়ী ও আশপাশের এলাকাগুলো থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করেন এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত বোঝাপড়ার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেন। অভিযোগ রয়েছে, গাঁজা সেবনকারীদের ‘হেরোইন’ দিয়ে মামলায় ফাঁসানো, আসামির কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জন্য গ্রেফতারের নাটক সাজানো—এসবই এখন এলাকাবাসীর কাছে পরিচিত ‘ডিএনসি রায়হান মডেল’ হিসেবে।
অবৈধ উপার্জনের বিলাসবহুল জীবনযাপন
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিদর্শক রায়হানের জীবনযাপন সরকারি বেতনের সীমা ছাড়িয়ে গেছে বহুদূর। তিনি মাসে ২৭ হাজার টাকার বিদেশি সিগারেট কিনেন, মায়াবন ফ্ল্যাটে থাকেন, এবং চড়েন ৫০ লক্ষ টাকার একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে। যা তাঁর প্রকৃত আয়বর্গের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
জব্দকৃত মাদকের বদল ও ‘মেডি’ নাটক
আরও অভিযোগ রয়েছে, অভিযান চালিয়ে মূল মাদক জব্দ করলেও চার্জশিটে “মেডি” নামক নিরীহ দ্রব্য দেখিয়ে আসামিদের চালান করেন তিনি। মূল মাদকগুলো পরে গোপনে গুড়িপাড়ায় বিক্রি করা হয় বলে দাবি করেছে একাধিক স্থানীয় সূত্র।
পলাতক মামলার নির্মমতা: পিয়ারুলের বাসায় অভিযান
সম্প্রতি গোদাগাড়ী উপজেলার পরমান্দপুরের কৃষক ও প্লট ব্যবসায়ী পিয়ারুলের বাসায় অভিযান চালায় ডিএনসি দল। যদিও পিয়ারুল ওই বাড়িতে থাকেন না, তার বিরুদ্ধে একটি পলাতক মাদক মামলা দায়ের করা হয়। অভিযানের সময় পিয়ারুলের স্ত্রী, প্রতিবেশী এবং শিশুদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া যায়।
পিয়ারুলের স্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার স্বামী যদি দোষী হয়, তাহলে বিচার করে শাস্তি দিন, আমাদের পরিবারকে কেনো টার্গেট করা হলো?” এই ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট প্রকাশ হলে ডিএনসি’র পক্ষ থেকে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই প্রতিবাদ জানায় রায়হান, যা নিয়ে প্রশাসনিকভাবে প্রশ্ন উঠেছে।
গোপনীয়তা ও তথ্য সংকোচন
ডিএনসি রাজশাহী অফিস ২০২৩ সালের পর থেকে মাসিক মাদক উদ্ধার সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশ বন্ধ করেছে। এখন শুধুমাত্র আটক ব্যক্তিদের নামমাত্র তথ্য প্রকাশ করা হয়, যা মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে স্বচ্ছতার ঘাটতির অভিযোগকে আরও জোরদার করে।
প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া ও নীরবতা
বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকরা বক্তব্য চাইলে পরিদর্শক রায়হান বলেন, “আমি ফোনে কোনো বক্তব্য দিবো না। স্বাক্ষাতে আসলে দিবো।” অন্যদিকে, রাজশাহী ডিএনসির উপ-পরিচালক আলমগীর হোসেন একাধিকবার ফোন করার পরও কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি।
—
বিশ্লেষণ ও প্রশ্ন
এই প্রতিবেদনে যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা উদ্বেগজনক এবং প্রশাসনিক দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। যখন সরকারের মাদকমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সচেষ্ট, তখন মাদকবিরোধী সংস্থার ভেতরেই দুর্নীতির শিকড় গজানো মানেই রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে আত্মঘাতী পচন।
ডিএনসি’র রাজশাহী অঞ্চলে নতুন করে শুদ্ধি অভিযান, পর্যবেক্ষণ ও রদবদলের প্রয়োজনীয়তা এখন স্পষ্ট। গোদাগাড়ী, চারঘাট, বাঘা – এই সীমান্তগুলোর মাদক চক্র ভাঙতে হলে সবার আগে নিজেদের ঘরদোর পরিষ্কার করা জরুরি।
ডেইলি বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানে রয়েছে এবং পরবর্তীতে আরও তথ্যপ্রমাণ ও ভুক্তভোগীদের কণ্ঠ প্রকাশ করা হবে। যদি আপনার কাছে এ সংক্রান্ত কোনও তথ্য থাকে, আমাদের ইনবক্সে জানান।