মোহাম্মদ হোসাইন, কক্সবাজার।
কক্সবাজারের টেকনাফে মানবপাচারকারী চক্রের গোপন আস্তানায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে গুলিবিদ্ধ সেনাসদস্য তিতাস শেখ (২৮) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে বিজিবি ও পুলিশের সমন্বয়ে পরিচালিত অভিযানে মানবপাচারকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে গুরুতর আহত হন সেনাসদস্য তিতাস শেখ। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহত সেনাসদস্য তিতাস শেখের বাড়ি ফরিদপুর জেলার লস্করদিয়া গ্রামে। দায়িত্ব পালনকালে তাঁর এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে সহকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
অভিযান চালিয়ে মানবপাচারকারী চক্রের আস্তানা থেকে ৫৭ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা নাগরিক রয়েছেন। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি দেশীয় ওয়ান শুটার গান ও একটি পিস্তল উদ্ধার করেছে যৌথ বাহিনী।
পাহাড়ের গোপন আস্তানায় যৌথ বাহিনীর অভিযান
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার দুপুরে টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৪ ও ২৬-এর মধ্যবর্তী দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মানবপাচারকারী চক্রের একটি গোপন আস্তানায় অভিযান পরিচালনা করে যৌথ বাহিনী।
সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা অংশ নেন। অভিযানের একপর্যায়ে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোলাগুলি শুরু হয়। এ সময় গুলিবিদ্ধ হন সেনাসদস্য তিতাস শেখ। পরে তাঁকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে আটকে রাখা হয়েছিল ৫৭ জনকে
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া ৫৭ জনের মধ্যে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে ওই পাহাড়ি আস্তানায় আটকে রাখা হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, সাগরপথে মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন সংগ্রহ করে পাহাড়ের ওই গোপন আস্তানায় আটকে রেখেছিল মানবপাচারকারী চক্রটি। সুযোগ বুঝে তাঁদের সমুদ্রপথে পাচারের পরিকল্পনা ছিল।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এমন আস্তানা পরিচালনার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানবপাচারকারী চক্রের নেটওয়ার্ক, তাদের সহযোগী এবং অর্থের লেনদেনের উৎস শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
এপিবিএন কর্মকর্তার বক্তব্য
১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. কাওসার সিকদার জানান, মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার এবং অস্ত্র উদ্ধারের লক্ষ্যে জেলা পুলিশের সঙ্গে যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সদস্য আহত হয়েছেন।
অভিযান চলমান, জানালেন পুলিশ সুপার
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ.এন.এম. সাজেদুর রহমান অভিযান চলমান থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পাহাড়ে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলছে। অভিযান শেষ হলে বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে।
স্থানীয় সূত্রে যাদের নাম আলোচনায়
স্থানীয় সূত্রে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক মো. আলম ও মো. সাদ্দাম ডাকাতের নাম মানবপাচারকারী চক্রের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গে উঠে এসেছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং তদন্তের ফলাফল এখনো নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।
মানবপাচার প্রতিরোধে কঠোর অভিযান জরুরি
টেকনাফ ও কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে সাগরপথে মানবপাচারের অভিযোগ রয়েছে। উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে কিংবা বিদেশে কর্মসংস্থানের আশ্বাস দিয়ে অসহায় মানুষকে পাচারকারীদের ফাঁদে ফেলার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
বিশেষ করে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার নামে অনেককে ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানে তুলে দেওয়া হয়। এসব যাত্রায় প্রাণহানি, নিখোঁজ হওয়া এবং নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে থাকে।
টেকনাফের এই অভিযানে ৫৭ জনকে উদ্ধার এবং অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান পরিচালনার গুরুত্ব আবারও সামনে এনেছে।
তবে শুধু আটক ও উদ্ধারের মধ্যেই অভিযান সীমাবদ্ধ না রেখে চক্রের মূল হোতা, অর্থদাতা, পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং দেশি-বিদেশি সহযোগীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
অন্যদিকে দায়িত্ব পালনকালে সেনাসদস্য তিতাস শেখের মৃত্যু দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য এক বেদনাদায়ক ঘটনা। তাঁর আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছে দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ।
সংবাদসূত্র: আইএসপিআর, পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
জনতার কণ্ঠস্বর