• শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৪৫ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
শিরোনাম
গাজীপুরে মেট্রিক্স গার্মেন্টসে আগুন, ৬৭ জনকে জীবিত উদ্ধার আটতলা ভবনের তৃতীয় তলায় অগ্নিকাণ্ড, আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিট সৌদি আরবে পাঠানোর নামে ১৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ, সর্বস্বান্ত প্রবাসী মিলন মাহফিলে বক্তার পেছনে লাখ টাকা ব্যয়, অথচ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ানো ইমামদের বেতন নিয়ে অবহেলার অভিযোগ; স্থায়ী বেতন কাঠামো প্রণয়নের দাবি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নৈরাজ্য ও সন্ত্রাসের প্রতিবাদে রাঙ্গুনিয়ায় যুবদলের বিক্ষোভ টেকনাফে মানবপাচারকারীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর গোলাগুলি, গুলিবিদ্ধ সেনাসদস্য তিতাস শেখের মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের বড় ধাক্কা, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যশোরের বেনাপোলে মোটরসাইকেল মিছিল করেছেন স্থলবন্দর হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়ন ৯২৫ ও ৮৯১-এর নেতাকর্মীরা। ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক চেতনায় বেনাপোলকে আধুনিক সীমান্ত নগরী গড়ার প্রত্যয়, জনআস্থার রাজনীতিতে আবু তাহের ভারত এমপি মাজেদ বাবুর বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্র ও হলফনামায় জালিয়াতির অভিযোগ হাসিনার সেই ‘৪০০ কোটির পিয়ন’ জাহাঙ্গীর: অনুসন্ধান থেকে ১০০ কোটি টাকা পাচারের মামলা, দুই বছরে কতদূর তদন্ত? পরিচয় নিয়ে নতুন বিতর্ক, কোন পক্ষ কতটা যৌক্তিক?

সার পাচার সিন্ডিকেট, দুই দশকের বিষবৃক্ষ ও বিপুল সম্পত্তি: পঞ্চগড়ের ডিএই উপপরিচালক আব্দুল মতিন সরকারের বিরুদ্ধে ৪ আইনি ধারায় কাঠগড়ায় ওঠার শঙ্কা

বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ ডেস্ক রিপোর্ট / ১৮৬ Time View
Update : শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬

 

সার পাচার সিন্ডিকেট, দুই দশকের বিষবৃক্ষ ও বিপুল সম্পত্তি: পঞ্চগড়ের ডিএই উপপরিচালক আব্দুল মতিন সরকারের বিরুদ্ধে ৪ আইনি ধারায় কাঠগড়ায় ওঠার শঙ্কা

বিশেষ অনুসন্ধানী সেল | পঞ্চগড় | ২২ আগস্ট ২০২৬

সরকারি বরাদ্দের রাসায়নিক সার সীমান্ত এলাকায় পাচার, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের জিম্মি করা, একই জেলায় টানা দুই দশকের বেশি সময় অবস্থান করে প্রশাসনিক প্রভাব বলয় তৈরি এবং অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার অভিযোগে তোপের মুখে পড়েছেন পঞ্চগড় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপপরিচালক (ডিডি) আব্দুল মতিন সরকার।

পঞ্চগড়ে সম্প্রতি জনতা কর্তৃক সারের বিশাল চালান আটক, ভ্যানচালকদের স্বীকারোক্তি এবং পরবর্তী সময়ে উপপরিচালকের বিতর্কিত ভূমিকার পর পুরো জেলা জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত চার গুচ্ছ গুরুতর অভিযোগ এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের আওতায় সম্ভাব্য শাস্তির আইনগত বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. সার পাচার, কৃত্রিম সংকট তৈরি ও চোরাচালানের গুরুতর অভিযোগ
ঘটনা ও বিবরণ:
নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মৌসুমে পঞ্চগড় জেলায় ১০১ মেট্রিক টন টিএসপি এবং ২৮৬ মেট্রিক টন ডিএপি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আগস্ট মৌসুমে আরও ১৬৭ মেট্রিক টন ডিএপি সার বরাদ্দ পায় জেলাটি। বিপুল পরিমাণ বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এক শ্রেণির অসাধু ডিলার ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সার চড়া দামে বিক্রি এবং সীমান্ত এলাকায় পাচারের অভিযোগ উঠে।

গত ১৪ আগস্ট পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলা থেকে সাকোয়া বাজারের দিকে নেওয়ার পথে দুটি ভ্যানে থাকা ৪০ বস্তা সরকারি সার স্থানীয় সচেতন জনতা হাতেনাতে আটক করে। ভ্যানচালকদের ধারণকৃত ভিডিও বক্তব্যে জানা যায়, এই সারগুলো আটোয়ারী এলাকা থেকেই অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। পঞ্চগড়ের জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব ও উপপরিচালক আব্দুল মতিন সরকার তড়িঘড়ি করে দাবি করেন—সারগুলো পঞ্চগড় জেলার নয়। তবে আটককৃত বস্তার ব্যাচ নম্বর, চালানের কপি, ডিলার কোড ও গুদাম রেজিস্টার পরীক্ষা না করেই এমন মন্তব্যে চরম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

আইনগত বিশ্লেষণ ও প্রযোজ্য শাস্তি:

প্রযোজ্য আইন: বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ (ধারা ২৫বি ও ২৫সি), অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫৬ এবং সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৫ (সংশোধিত)।

অপরাধের ধরণ: সরকারি সার অনিয়ম করে গুদামজাতকরণ, পাচারে প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ মদদ, ডিলার নীতিমালার চরম লঙ্ঘন এবং চোরাচালান।

শাস্তির বিধান: বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫বি ও ২৫সি ধারা অনুযায়ী সরকারি সার চোরাচালান বা কালোবাজারির সর্বনিম্ন শাস্তি ১৪ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং অপরাধের ভয়াবহতা ভেদে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অনাদায়ে মোটা অঙ্কের জরিমানা। এছাড়া অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন লঙ্ঘনের দায়ে সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা যেতে পারে।

২. একই জেলায় ২১ বছর অবস্থান, শ্বশুরবাড়ির প্রভাব ও স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest)
ঘটনা ও বিবরণ:
২১তম বিসিএস (কৃষি) ক্যাডারের কর্মকর্তা আব্দুল মতিন সরকার সিলেট বিভাগের চুনারুঘাটে কর্মজীবন শুরু করার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই পঞ্চগড়ে বদলি হয়ে আসেন। এর পর থেকে আর তাঁকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

আটোয়ারী উপজেলা সহকারী কৃষি কর্মকর্তা

পঞ্চগড় সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা

অতিরিক্ত উপপরিচালক (এডিডি)

বীজ প্রত্যয়ন কর্মকর্তা (SCA)

উপপরিচালক (ডিডি) — জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর

দীর্ঘ ২১ বছর ধরে একই জেলার বিভিন্ন প্রশাসনিক ও তদারকি পদে পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, তাঁর শ্বশুরবাড়ি পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলায়—যেখান থেকেই সার পাচারের ঘটনাটি ঘটেছে। সরকারি দায়িত্বে থেকে একই এলাকায় দীর্ঘদিন অবস্থান এবং স্বজনদের ভৌগোলিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়া সরাসরি ‘স্বার্থের সংঘাত’ (Conflict of Interest) তৈরি করে।

আইনগত বিশ্লেষণ ও প্রযোজ্য শাস্তি:

প্রযোজ্য বিধিমালা: সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ক্যাডার অফিসার বদলি-পদায়ন নীতিমালা।

অপরাধের ধরণ: স্বজনপ্রীতি, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক বলয় তৈরি এবং নিয়মিত বদলি প্রক্রিয়া ব্যাহত করা।

শাস্তির বিধান: প্রশাসনিক বিধিমালা লঙ্ঘনের দায়ে সরকারি স্বার্থে তাৎক্ষণিক বাধ্যতামূলক অবসর বা বদলি এবং তদারকিতে অবহেলার কারণে বিভাগীয় মামলা (Departmental Proceedings) রুজু করে পদাবনতির বিধান রয়েছে।

৩. অবৈধ সম্পদ অর্জন, আয়কর ফাঁকি ও সম্পদ বিবরণী গোপন
ঘটনা ও বিবরণ:
দীর্ঘ দুই দশক একই এলাকায় অবস্থানের সুযোগ নিয়ে বিপুল দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তাঁর বৈধ আয়ের উৎসের (মূল বেতন ও সরকারি ভাতা) সাথে তাঁর এবং তাঁর পরিবারের নামে থাকা জমি, ফ্ল্যাট, ব্যাংক ব্যালেন্স ও অন্যান্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ব্যাপক সঙ্গতিহীনতা পাওয়া গেছে বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর সম্পদ বিবরণী দাখিল করার কথা থাকলেও তিনি তা সঠিকভাবে করেছেন কিনা তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।

আইনগত বিশ্লেষণ ও প্রযোজ্য শাস্তি:

প্রযোজ্য আইন: দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ (ধারা ২৭/১), সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ (বিধি ১১, ১২ ও ১৩) এবং আয়কর আইন, ২০২৩।

অপরাধের ধরণ: জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে অবৈধ সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন করা এবং ভুয়া আয়কর বিবরণী উপস্থাপন।

শাস্তির বিধান: দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা অনুযায়ী জ্ঞাত আয়ের উৎস বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের প্রমাণ মিললে ৩ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্জিত সমস্ত অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করার সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে।

৪. ‘রংপুরে অফিসিয়াল মিটিং’—ভুয়া ভ্রমণ, রেজিস্টার জালিয়াতি ও TA/DA আত্মসাৎ
ঘটনা ও বিবরণ:
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আব্দুল মতিন সরকার অফিসের কাজের দোহাই দিয়ে কিংবা ‘রংপুরে জরুরি দাপ্তরিক সভা’ দেখিয়ে প্রায়শই কর্মস্থল পঞ্চগড় ত্যাগ করতেন। অথচ রংপুরের আঞ্চলিক কার্যালয় বা সংশ্লিষ্ট মিটিংয়ের কার্যবিবরণী ও উপস্থিতি তালিকায় অনেক সময়ই তাঁর সুনির্দিষ্ট নাম থাকত না। সরকারি যানবাহন ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সফর করা, মুভমেন্ট রেজিস্টারে অসত্য তথ্য লিপিবদ্ধ করা এবং ভুয়া ভ্রমণ ভাতা (TA/DA) বিল করে সরকারি কোষাগারের অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

আইনগত বিশ্লেষণ ও প্রযোজ্য শাস্তি:

প্রযোজ্য আইন: দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (ধারা ৪০৯, ৪২০, ৪৬৮ ও ৪৭১) এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮।

অপরাধের ধরণ: সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার, ভুয়া নথিপত্র তৈরি, প্রতারণা এবং সরকারি অর্থ আত্মসাৎ।

শাস্তির বিধান:

ফৌজিদারি শাস্তি: দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা (সরকারি কর্মচারী কর্তৃক বিশ্বাস ভঙ্গ) এবং ৪২০ ধারা (প্রতারণা) অনুযায়ী প্রমাণিত হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড।

প্রশাসনিক শাস্তি: শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা ২০১৮ অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতি’র দায়ে চাকরি থেকে বরখাস্ত (Dismissal from Service), বাধ্যতামূলক অবসর বা নিম্নপদে অবনমন।

অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য উপপরিচালক আব্দুল মতিন সরকারের দাপ্তরিক মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

তবে পঞ্চগড়ের সচেতন নাগরিক সমাজ ও কৃষক সংগঠনের দাবি—উত্থাপিত চার গুচ্ছ অভিযোগ কোনো ঢিলেঢালা তদন্ত নয়, বরং সুনির্দিষ্ট দাপ্তরিক নথি, চালানের ব্যাচ নম্বর, আয়কর নথিপত্র ও দুদকের সমন্বয়ে গঠিত নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।

বিষয়টি পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক এবং জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির দৃষ্টিগোচর করা হলে, অপরাধের সাথে যারাই জড়িত থাকুক না কেন—নথি যাচাই সাপেক্ষে কঠোর আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দৃঢ় আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।


More News Of This Category
bdit.com.bd