• শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:১১ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
শিরোনাম
গাজীপুরে মেট্রিক্স গার্মেন্টসে আগুন, ৬৭ জনকে জীবিত উদ্ধার আটতলা ভবনের তৃতীয় তলায় অগ্নিকাণ্ড, আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিট সৌদি আরবে পাঠানোর নামে ১৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ, সর্বস্বান্ত প্রবাসী মিলন মাহফিলে বক্তার পেছনে লাখ টাকা ব্যয়, অথচ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ানো ইমামদের বেতন নিয়ে অবহেলার অভিযোগ; স্থায়ী বেতন কাঠামো প্রণয়নের দাবি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নৈরাজ্য ও সন্ত্রাসের প্রতিবাদে রাঙ্গুনিয়ায় যুবদলের বিক্ষোভ টেকনাফে মানবপাচারকারীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর গোলাগুলি, গুলিবিদ্ধ সেনাসদস্য তিতাস শেখের মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের বড় ধাক্কা, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যশোরের বেনাপোলে মোটরসাইকেল মিছিল করেছেন স্থলবন্দর হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়ন ৯২৫ ও ৮৯১-এর নেতাকর্মীরা। ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক চেতনায় বেনাপোলকে আধুনিক সীমান্ত নগরী গড়ার প্রত্যয়, জনআস্থার রাজনীতিতে আবু তাহের ভারত এমপি মাজেদ বাবুর বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্র ও হলফনামায় জালিয়াতির অভিযোগ হাসিনার সেই ‘৪০০ কোটির পিয়ন’ জাহাঙ্গীর: অনুসন্ধান থেকে ১০০ কোটি টাকা পাচারের মামলা, দুই বছরে কতদূর তদন্ত? পরিচয় নিয়ে নতুন বিতর্ক, কোন পক্ষ কতটা যৌক্তিক?

উপস্থিতির খাতায় শিক্ষক নিয়মিত, বাস্তবে অনুপস্থিত! কাগজে ২০৪ শিক্ষার্থী, সরেজমিনে ১৭; প্রতিবন্ধী স্কুল কাগজেই সব, বাস্তবে ফাঁকা

বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ ডেস্ক রিপোর্ট / ৭৭ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬

 

উপস্থিতির খাতায় শিক্ষক নিয়মিত, বাস্তবে অনুপস্থিত!
কাগজে ২০৪ শিক্ষার্থী, সরেজমিনে ১৭; প্রতিবন্ধী স্কুল কাগজেই সব, বাস্তবে ফাঁকা
আসাদুজ্জামান আপেল, পঞ্চগড়
২০ আগস্ট ২০২৬
পঞ্চগড় সদর উপজেলার উত্তর জালাসী এলাকায় অবস্থিত ‘দেশ প্রতিবন্ধী স্কুল’ নিয়ে উঠেছে অনিয়ম, চরম অব্যবস্থাপনা ও নজিরবিহীন হাজিরা জালিয়াতির নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি ও অধিকার সুনিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার কথা বলা হলেও, বাস্তবে খাতা-কলমে তথ্য সাজিয়ে ফায়দা লোটার ভয়াবহ অভিযোগ উঠে এসেছে। কাগজে-কলমে বিদ্যালয়টিতে ২০৪ জন প্রতিবন্ধী শিশু শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধিত এবং তাদের সুষ্ঠু পাঠদানের জন্য ২৫ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিযুক্ত রয়েছেন। কিন্তু সরেজমিনে তথ্য অনুসন্ধানে গিয়ে মিলেছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। বাস্তব উপস্থিতির সঙ্গে খাতা-কলমের এই আকাশ-পাতাল গরমিল দেখে স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
কাগজে-কলমে সুবিশাল বহর, বাস্তবে ফাঁকা শ্রেণীকক্ষ
সম্প্রতি সরেজমিনে ‘দেশ প্রতিবন্ধী স্কুল’-এ গিয়ে দেখা যায়, শ্রেণীকক্ষগুলো প্রায় শূন্য। কাগজপত্রে থাকা ২০৪ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে বাস্তবে উপস্থিতি ছিল মাত্র ১৭ জন শিশু। একই সময়ে খাতায় নিবন্ধিত ২৫ জন শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে বিদ্যালয়ে উপস্থিত পাওয়া যায় মাত্র তিনজন শিক্ষককে। বিদ্যালয়টির অবকাঠামো, পরিবেশ ও দৈনিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে—কোনো প্রকৃত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা নয়, বরং কেবল নথিপত্র সাজিয়ে রাখার মধ্য দিয়েই সচল রাখা হয়েছে এই তথাকথিত বিদ্যাপীঠ।
ভুয়া হাজিরা ও ভূতের স্বাক্ষর
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিদ্যালয়টি প্রায় সময়ই সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। সপ্তাহের পর সপ্তাহ নামমাত্র খোলা হলেও সেখানে নিয়মিত কোনো পাঠদান হয় না। অথচ অনুসন্ধানের সময় বিদ্যালয়টির নিয়মিত হাজিরা খাতা পর্যালোচনা করে পাওয়া গেছে এক অবিশ্বাস্য চিত্র। খাতা পর্যালোচনায় দেখা যায়, সকল শিক্ষক-কর্মচারীকে প্রতিদিন নিয়ম করে বিদ্যালয়ে উপস্থিত দেখানো হয়েছে এবং প্রত্যেকের নামের পাশে নিয়মিত স্বাক্ষর রয়েছে। বাস্তবে শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলেও প্রতিদিন খাতায় কীভাবে হাজিরার স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়—এ নিয়ে সচেতন মহলে মারাত্মক অনিয়মের প্রশ্ন উঠেছে।
প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বজ্ঞানহীন ও কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাখ্যা
হাজিরা খাতার এমন বিশাল গরমিল ও জালিয়াতির বিষয়ে মুখোমুখি হলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তসলিমা খাতুন এক প্রকার দায়সারা ও আত্মঘাতী স্বীকারোক্তি দেন। তিনি বলেন, “আমি আমার শিফট অনুযায়ী পাঠদান করি। শিক্ষকরা সবাই সপ্তাহে দুই দিন করে আসে। তবে হাজিরা খাতায় প্রতিদিনের স্বাক্ষর করা হয়।”
প্রধান শিক্ষকের এই বিষ্ফোরক বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই নীতিগত প্রশ্ন সামনে এসেছে—শিক্ষক ও কর্মচারীরা যদি সপ্তাহে মাত্র দুই দিন কর্মস্থলে আসেন, তবে হাজিরা খাতায় প্রতিদিনের উপস্থিতির ভুয়া স্বাক্ষর কীভাবে গ্রহণযোগ্য হয়? আর ২৫ জন অভিজ্ঞ ও বেতনভুক্ত স্টাফের বিপরীতে যদি মাত্র ৩ জন দিয়ে টেনেটুনে দিন চালানো হয়, তবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের প্রকৃত শেখার সুযোগ কীভাবে সুনিশ্চিত সম্ভব?
তথ্য এড়িয়ে অনিয়ম ঢাকার আকুতি পরিচালকের
ঘটনার গভীরে যেতে অনুসন্ধানের একপর্যায়ে কথা বলা হয় বিদ্যালয়টির পরিচালক জহিরুল ইসলামের সঙ্গে। বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এই নজিরবিহীন অনুপস্থিতি, অকার্যকর পাঠদান এবং হাজিরা খাতায় প্রতিদিন ভুয়া স্বাক্ষরের মতো গুরুতর অনিয়ম নিয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা কিংবা সদুত্তর দিতে পারেননি। অনিয়মের বিষয়গুলো সরাসরি এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, “আপনারা আমাদের পজিটিভ সংবাদ প্রচার করেন, যাতে আমাদের বিদ্যালয়টি অনুমোদনপ্রাপ্ত এবং এমপিওভুক্ত হয়।”
পরবর্তীতে ভূতের মতো হাজিরার স্বাক্ষর, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম নিয়ে পুনরায় সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করা হলে পরিচালক জহিরুল ইসলাম কোনো বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং প্রসঙ্গটি সম্পূর্ণ এড়িয়ে যান। অনিয়ম ও ভুয়া তথ্য ধামাচাপা দিয়ে গণমাধ্যমকে ‘পজিটিভ খবর’ প্রকাশের আবেদন সাংবাদিকতার মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী এবং পুরো বিষয়টিকে আরও গভীর সন্দেহের দিকে ঠেলে দেয়।
বিপুল অঙ্কের অনিয়মের আশঙ্কা ও স্থানীয়দের ক্ষোভ
শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্ট সচেতন মহল মনে করছেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ও শারীরিক-মানসিকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা কোমলমতি শিশুদের শিক্ষা ও মানবাধিকারের কথা বলে কাগজ-কলমে কাল্পনিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের তালিকা তৈরি করা একটি অত্যন্ত ঘৃণ্য ও অনাকাঙ্ক্ষিত তৎপরতা। সরকারি বা বেসরকারি সুযোগ-সুবিধা, অনুদান এবং ভবিষ্যতে এমপিওভুক্তি কিংবা সরকারি স্বীকৃতি হাতিয়ে নেওয়ার মতলবেই কি এমন বিশাল ভুয়া কাঠামো প্রস্তুত রাখা হয়েছে?—এখন এটিই সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। অনতিবিলম্বে দেশ প্রতিবন্ধী স্কুলের অনুমোদন, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সংখ্যা, শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগপত্র, অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং হাজিরা খাতার জালিয়াতির সঠিক রহস্য উদঘাটনে জেলা প্রশাসনের জরুরি ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
তদারকির অভাব ও নীতিমালার ফাঁকফোকর
এ বিষয়ে পঞ্চগড় জেলা প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি সরকারি তদারকির সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “বিশেষ বিদ্যালয়গুলোর সরকারি অনুমোদন, স্বীকৃতি ও এমপিওভুক্তি না থাকায় এগুলোর ওপর আমাদের সরাসরি আইনগত তদারকি চালানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। অধিকাংশ বিদ্যালয়ই কোনো না কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার অধীনে পরিচালিত হওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, বেতন-ভাতা ও অভ্যন্তরীণ সব কার্যক্রম ওই সব সংস্থার মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয়।”
আইনগত কাঠামোর বিষয়ে তিনি আরও স্পষ্ট করে জানান, “‘প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কিত সমন্বিত বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা, ২০১৯’ অনুযায়ী যেকোনো বিশেষ বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য পৃথকভাবে সরকারি নিবন্ধন গ্রহণ করা আইনিভাবে বাধ্যতামূলক। নিবন্ধন ব্যতিরেকে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালনা করা মোটেও বিধিসম্মত নয়। তবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের কল্যাণের কথা চিন্তা করে আমরা অনেক সময় মানবিক দৃষ্টিকোণ ও সহানুভূতির সঙ্গে বিষয়টি প্রত্যক্ষ করি। বর্তমানে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ, সচেতনতা তৈরি এবং এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোরভাবে নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য করার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।”
উচিত পদক্ষেপ ও তদন্তের জোরালো দাবি
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, মানবিক সহানুভূতি বা শিথিলতার সুযোগ নিয়ে কোনো অসাধু চক্র যদি আইন ও নীতিমালার তোয়াক্কা না করে কাগজ-কলমে ভুয়া অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে, তবে তার চূড়ান্ত মাশুল গুনতে হবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদেরকেই। নামকাওয়াস্তে চলা এসব প্রতিষ্ঠান প্রকৃত শিশুদের সেবা দেওয়া থেকে বঞ্চিত করছে এবং শিক্ষা খাতকে কলঙ্কিত করছে। পঞ্চগড়ের সর্বস্তরের সুশীল সমাজের জোর দাবি—অবিলম্বে ‘দেশ প্রতিবন্ধী স্কুল’-এর নথিপত্র, শিক্ষক নিয়োগ ও উপস্থিতির খাতা সরেজমিনে যাচাই করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে বিশেষ শিশুদের নাম ভাঙিয়ে কেউ অনৈতিক সুবিধা হাসিল করতে না পারে।


More News Of This Category
bdit.com.bd