প্রতারণা, মামলার নথি চুরি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
দুদকের নজরে আনার দাবি জামালপুরে
জাকিরুল ইসলাম বাবু, জামালপুর প্রতিনিধি
জামালপুর শহরের কাচারিপাড়া এলাকায় বেড়ে ওঠা এবং ইসলামপুর উপজেলার মোশারফগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা মেহেদী নোমানের বিরুদ্ধে প্রতারণা, প্রভাব খাটানো, মামলার নথি চুরি ও বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি নানা কৌশলে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন এবং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দুদকের তদন্তের দাবি জোরালো করেছে।
অভিযোগ রয়েছে, মেহেদী নোমান বর্তমানে শহরে বিলাসবহুল বাড়িতে বসবাস করেন এবং কোটি টাকার গাড়ি ব্যবহার করেন। তার আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে একাধিক আর্থিক অনিয়মের তথ্য সামনে এলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পূর্বে তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ হলে সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া হয় এবং সংবাদ বন্ধে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করা হয়। পাওনাদাররা টাকা চাইতে গেলে উল্টো তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ। এমনকি তার এক ভাই সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা—এই পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধান
ঘটনার এক পর্যায়ে বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। অভিযোগকারীরা জানান, গোয়েন্দা সংস্থা প্রাথমিকভাবে কিছু তথ্যের সত্যতা পেয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের আইনের আশ্রয় নিতে পরামর্শ দিয়েছে। পরবর্তীতে এক পাওনাদার আদালতে মামলা দায়ের করেন।
মামলার নথি চুরির চেষ্টা
গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে আদালতে দায়েরকৃত একটি মামলার নথি চুরির চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর মামলার কাগজপত্র সরিয়ে ফেলতে চেষ্টার ঘটনা ঘটে। এক সহযোগীকে হাতেনাতে আটক করা হয় এবং তিনি লিখিতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম ব্যবহার
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা–এর ব্যক্তিগত চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে এক চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সহকারী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অনুমতি ছাড়া তাদের নাম ব্যবহার করা হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পূর্বের মামলা ও কারাবাস
স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রতারণার অভিযোগে পূর্বেও একটি মামলায় মেহেদী নোমান কারাগারে ছিলেন এবং পরে জামিনে মুক্ত হন। এছাড়া তার গাড়ি থেকে বিদেশি মদের বোতল উদ্ধার করে জনতা তাকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে—এমন দাবিও উঠেছে। যদিও এ বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ মেলেনি।
দুদকের তদন্ত দাবি
অভিযোগকারীরা বলছেন, মেহেদী নোমানের বিপুল সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখা জরুরি। তারা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)–এর চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে সুষ্ঠু তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। অভিযোগে তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব তলব করে সম্পদের উৎস যাচাইয়েরও দাবি তোলা হয়েছে।
এ বিষয়ে মেহেদী নোমানের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
যদি আদালতে প্রমাণিত হয়—তাহলে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী নিম্নোক্ত শাস্তি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রযোজ্য হতে পারে।
প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাৎ
দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ধারা ৪২০ অনুযায়ী প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে। এ ধরনের মামলা সাধারণত থানায় দায়ের হয় এবং তদন্ত শেষে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা দায়রা জজ আদালতে বিচার হয়।
ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি
দণ্ডবিধির ধারা ৫০৬ অনুযায়ী অপরাধের ধরন অনুযায়ী কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। তদন্ত করে থানা পুলিশ, বিচার করে ফৌজদারি আদালত।
মামলার নথি চুরি বা গায়েবের চেষ্টা
সরকারি নথি চুরি, জালিয়াতি বা নষ্ট করার অভিযোগ প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা প্রযোজ্য হতে পারে। অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী ৩ থেকে ১০ বছর বা তার বেশি কারাদণ্ড হতে পারে। তদন্ত করবে পুলিশ বা সিআইডি, বিচার হবে দায়রা জজ আদালতে।
অবৈধ সম্পদ অর্জন বা আয়ের উৎস গোপন
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ প্রমাণিত হলে ৩ থেকে ১০ বছর বা তার বেশি কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড এবং সম্পদ বাজেয়াপ্তের বিধান রয়েছে। তদন্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচার হয় বিশেষ জজ আদালতে।
মানিলন্ডারিং
মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী ৪ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে। তদন্ত করতে পারে সিআইডি বা দুদক, বিচার হয় বিশেষ ট্রাইব্যুনালে।
লাইসেন্স ছাড়া মদ সংরক্ষণ বা বহন
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া অ্যালকোহল রাখলে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে। তদন্ত করে ডিবি পুলিশ বা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বিচার হয় বিশেষ ট্রাইব্যুনালে।
ক্ষমতার অপব্যবহার বা প্রভাব খাটানো
যদি কোনো সরকারি কর্মকর্তা বেআইনিভাবে প্রভাব খাটান, তাহলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিভাগীয় ব্যবস্থা ছাড়াও দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত হতে পারে। অপরাধ প্রমাণিত হলে কারাদণ্ড, চাকরিচ্যুতি বা প্রশাসনিক শাস্তি হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এসব শাস্তি তখনই প্রযোজ্য হবে, যখন আদালতে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হবে। তদন্তের আগে কাউকে দোষী বলা আইনগতভাবে সঠিক নয়। সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।