বেনাপোলে কুয়েত প্রবাসীর ‘ডেথ স্কোয়াড’: ২৬ বছর ধরে শ্যালক নিখোঁজ, শশুরের মৃত্যুর পর সম্পদ দখল ও অস্ত্রের ঝনঝনানি
নিজস্ব অনুসন্ধানী প্রতিবেদক | বেনাপোল, যশোর
সীমান্তবর্তী জনপদ যশোরের বেনাপোলে এক কুয়েত প্রবাসীর ভয়ংকর অপরাধ সাম্রাজ্যের খবর পাওয়া গেছে। অভিযোগ উঠেছে, বিবাদী দলিল মোড়ল (পিতা: বাবর আলী মোড়ল) প্রবাসে বসেও তার ভাড়াটে বাহিনীর মাধ্যমে এলাকায় গুম, খুন, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের এক বিশাল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন। গত ২০২৫ সালের মার্চ মাসে শশুর আমের আলীর মৃত্যুর পর তার পুরো সম্পত্তি দখল করে নিয়েছেন এই ঘাতক জামাতা। বর্তমানে তার প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছেন ছোট শ্যালক রফিকুল শেখ, যাকে হত্যার জন্য একাধিকবার প্রাণঘাতী হামলা চালানো হয়েছে।
২৬ বছরের গুম রহস্য: গোলাম রসূল কোথায়?
এই অপরাধ নাটকের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় শুরু হয় ২৬ বছর আগে। আমের আলীর বড় ছেলে গোলাম রসূলকে কুয়েত নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাথে নিয়ে যান দলিল মোড়ল। আড়াই দশক পার হলেও গোলাম রসূল আর ফিরে আসেননি। স্থানীয়দের মধ্যে প্রবল গুঞ্জন ও আশঙ্কা রয়েছে যে, উত্তরাধিকারী হিসেবে গোলাম রসূলকে সরিয়ে দিতে পারলে শশুরের অঢেল সম্পত্তি দখল করা সহজ হবে—এই অশুভ উদ্দেশ্যে দলিল মোড়ল তাকে বিদেশের মাটিতেই পরিকল্পিতভাবে হত্যা বা গুম করেছেন। আজ অবধি বড় ছেলের অপেক্ষায় পথ চেয়ে থেকে কবরে গেছেন পিতা আমের আলী।
শশুরের মৃত্যুর পর ‘মার্কেট’ দখল ও রাজত্ব:
২০২৫ সালের মার্চ মাসে আমের আলীর মৃত্যুর পর শুরু হয় দলিল মোড়লের আসল তণ্ডব। বেনাপোল পৌরসভার ঠিক সামনে আমের আলীর মূল্যবান মার্কেট ও ভূ-সম্পত্তি রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এই সম্পত্তির মালিক তার একমাত্র জীবিত ছেলে রফিকুল শেখ হলেও, দলিল মোড়ল প্রবাসে থেকে তার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পুরো মার্কেট ও সম্পত্তি জবরদখল করে নিয়েছেন। নিজের পৈতৃক ভিটায় এখন রফিকুল শেখ পরবাসী।

মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও ভাড়াটিয়াদের ওপর নির্যাতন:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দলিল মোড়ল ও তার স্ত্রী বেনাপোলের বড় আঁচড়া এবং ডুবপাড়া এলাকায় মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন। সীমান্ত ঘেঁষা এলাকা হওয়ায় তারা এই রুট ব্যবহার করে দেশে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, মার্কেটের পুরনো ভাড়াটিয়াদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালাচ্ছে এই সিন্ডিকেট। দোকানে তালা দেওয়া, মালপত্র ফেলে দেওয়া এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ভাড়াটিয়াদের জিম্মি করে রাখা হয়েছে।
রফিকুল শেখকে হত্যার মাস্টারপ্ল্যান:
বর্তমানে ছোট শ্যালক রফিকুল শেখ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন দলিল মোড়ল। রফিকুল শেখ জানান, “আমার বড় ভাইকে সে ২৬ বছর আগে গুম করেছে। গত বছর আমার বাবা মারা যাওয়ার পর সে আমাকেও মেরে ফেলার চেষ্টা করছে। সে কুয়েতে বসে ভিডিও কলে তার খুনি বাহিনীকে নির্দেশ দেয় আমাকে আক্রমণ করতে। আমার নামে একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে আমাকে এলাকাছাড়া করার চেষ্টা চলছে। আমি বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”
প্রশাসনের প্রতি দাবি:
দলিল মোড়লের এই দীর্ঘ অপরাধ খতিয়ান এলাকায় আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী রফিকুল শেখের দাবি:
১. ২৬ বছর আগে নিখোঁজ গোলাম রসূলের অবস্থান নিশ্চিত করতে PBI বা CID তদন্ত।
২. বেনাপোল পৌরসভার সামনে অবৈধভাবে সম্পদ উদ্ধার।
৩. দলিল মোড়লের মাদক ও অস্ত্র সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে র্যাবের সাঁড়াশি অভিযান।
৪. ইন্টারপোলের মাধ্যমে কুয়েত প্রবাসী দলিল মোড়লকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার।
বিবাদী দলিল মোড়ল ও তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে অত্যন্ত গুরুতর এবং জামিন অযোগ্য অপরাধ। প্রমাণিত হলে বিবাদীকে নিম্নলিখিত কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে:
১. পরিকল্পিত গুম ও হত্যা (গোলাম রসূল সংক্রান্ত):
আইন: দণ্ডবিধি (Penal Code) ১৮৬০-এর ৩০২ এবং ৩৬৪ ধারা।
শাস্তি: যদি প্রমাণিত হয় যে গোলাম রসূলকে হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণ বা গুম করা হয়েছে, তবে প্রধান আসামির মৃত্যুদণ্ড (Death Sentence) অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ২৬ বছর আগের ঘটনা হলেও ‘গুম’ একটি চলমান অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
২. মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের কারবার:
আইন: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ এবং অস্ত্র আইন (Arms Act), ১৮৭৮।
শাস্তি: সীমান্ত এলাকায় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা করার অপরাধে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। বিশেষ করে আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অপরাধে সর্বনিম্ন ১০ থেকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড নিশ্চিত।
৩. অবৈধ ভূমি দখল ও জালিয়াতি:
আইন: দণ্ডবিধি ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮ এবং ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩।
শাস্তি: জালিয়াতির মাধ্যমে অন্যের সম্পত্তি আত্মসাৎ এবং পেশিশক্তির জোরে জমি দখলের অপরাধে নতুন ভূমি আইনে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং বিপুল পরিমাণ অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া আদালত চাইলে অবৈধ স্থাপনা (বিল্ডিং) গুঁড়িয়ে দেওয়ার আদেশ দিতে পারেন।
৪. হত্যার ষড়যন্ত্র ও জখম (রফিকুল শেখ সংক্রান্ত):
আইন: দণ্ডবিধি ৩০৭ (হত্যার চেষ্টা) এবং ৫০৬ (প্রাণনাশের হুমকি)।
শাস্তি: রফিকুল শেখের ওপর হামলার প্রমাণ এবং হত্যার ষড়যন্ত্রের ডিজিটাল প্রমাণ (ভিডিও কল/অডিও রেকর্ড) থাকলে আসামির ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে।
প্রশাসনের প্রতি বিশেষ দাবি (জরুরি অ্যাকশন):
রেড নোটিশ জারি: যেহেতু বিবাদী দলিল মোড়ল বিদেশে পলাতক থেকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাই ইন্টারপোলের (Interpol) মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ‘রেড নোটিশ’ জারি করে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ: অপরাধলব্ধ অর্থ বা রেমিট্যান্সের অপব্যবহার করে মাদক ও অস্ত্র সিন্ডিকেট চালানোর দায়ে তার সকল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অবিলম্বে ফ্রিজ (Freeze) করা হোক।
পাসপোর্ট বাতিল: বিবাদীর পাসপোর্ট বাতিল করে তাকে কুয়েত থেকে ডিপোর্ট (Deport) করার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
এ বিষয়ে কুয়েত পুরো প্রবাসী দলিল মোড়লের বক্তব্য নেয়ার চেষ্টা করলে, তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এছাড়াও স্থানীয়ভাবে সহযোগিতা করা বেশ কয়েকজনের নাম আমাদের কাছে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, অর্থের বিনিময়ে তারা সাধারণ মানুষের ওপর নানা ধরনের অত্যাচার ও জুলুমে লিপ্ত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।
তাদের মধ্যে বেনাপোল চেকপোস্টের প্রাইভেট স্ট্যান্ডের একজন কর্মকর্তার নামও এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ৫ তারিখের পর রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে নিজেকে বিএনপির পরিচয়ে উপস্থাপন করছেন। অথচ এর আগে তিনি বেনাপোল পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতির ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
বিষয়টি তদন্তাধীন থাকায় গোপনীয়তার স্বার্থে এই মুহূর্তে সংশ্লিষ্টদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হলে পরবর্তী প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য ও নাম প্রকাশ করা হবে,
ভুক্তভোগী রফিকুল শেখের আর্তনাদ:
“আমি শুধু আমার বাবার সম্পদ নয়, আমার নিখোঁজ ভাইয়ের বিচার চাই। দলিল মোড়ল প্রবাসে বসে আমাকে মারার জন্য খুনি পাঠাচ্ছে। আমি প্রশাসনের কাছে জীবনের নিরাপত্তা এবং এই খুনি-মাদক ব্যবসায়ীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”