বিদেশে পাঠানোর নামে স্বপ্ন বিক্রির মহোৎসব: শেরপুরের যুবক আকাশের আর্তনাদ ও দালাল চক্রের জাল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | মো: সেলিম রানা (সৌদি আরব)
তারিখ: ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
রিয়াদ, সৌদি আরব: ময়মনসিংহের শেরপুর জেলার খুনুয়া নতুন পাড়া এলাকার যুবক মোহাম্মদ আকাশ। উন্নত জীবনের আশায় এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে ধার-দেনা করে পাড়ি জমিয়েছিলেন মরুভূমির দেশ সৌদি আরবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়ে বর্তমানে সৌদি আরবের রাস্তায় রাস্তায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত: যেভাবে পাতা হয় প্রতারণার জাল
ভুক্তভোগী আকাশের দেওয়া তথ্যমতে, এই প্রতারণার মূল হোতা তার নিজ এলাকারই প্রভাবশালী দালাল সোহেল রানা এবং তার ফুফু মনিষ। ঢাকা মহাখালী সৈনিক ক্লাবের সামনে অবস্থিত একটি নামসর্বস্ব অফিসের মাধ্যমে তারা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে।
আকাশের সাথে দালাল চক্রের চুক্তিতে উল্লেখ ছিল:
ভিসার ধরণ: নিশ্চিত কোম্পানি ভিসা।
বেতন: মাসিক ১৫০০ রিয়াল।
কর্মঘণ্টা: দৈনিক ৮ ঘণ্টা ডিউটি।
অন্যান্য সুবিধা: থাকা-খাওয়ার সম্পূর্ণ খরচ কোম্পানি বহন করবে।
কিন্তু সৌদি আরবে পা রাখার পরই আকাশের সামনে ফুটে ওঠে এক রূঢ় বাস্তবতা। চুক্তির কোনো শর্তই পূরণ করেনি চক্রটি।
বর্তমান পরিস্থিতি: অনিশ্চয়তা ও জীবনঝুঁকি
বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থানরত আকাশ জানান, তাকে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানিতে কাজ দেওয়া হয়নি। বরং ‘ফ্রি ভিসার’ নামে তাকে বিভিন্ন জায়গায় অবৈধভাবে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। কোনো নির্দিষ্ট কর্মস্থল না থাকায় তাকে প্রতিনিয়ত স্থান পরিবর্তন করতে হচ্ছে, যা সৌদি আরবের আইন অনুযায়ী অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
আকাশ ক্ষোভের সাথে বলেন:
“আমাকে কোম্পানি ভিসার কথা বলে আনা হলেও এখানে এসে দেখি আমি দালালের হাতের পুতুল। না আছে থাকার জায়গা, না আছে খাওয়ার নিশ্চয়তা। বেতন তো দূরের কথা, এখন জীবন বাঁচানোই দায় হয়ে পড়েছে।”
প্রবাসীদের ঐক্য ও আইনি পদক্ষেপ
আকাশের এই অসহায়ত্বের খবর পেয়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছে প্রবাসীদের জনপ্রিয় সংগঠন ‘সৌদি প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা ১০১ টিম’। সংগঠনটি এই দালাল চক্রের বিরুদ্ধে প্রবাসে ও দেশে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে।
আকাশ ইতিমধ্যেই সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীদের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তিনি তার সাথে হওয়া এই অন্যায়ের বিচার চেয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস, রিয়াদ এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
দালাল চক্রের অপতৎপরতা ও জননিরাপত্তা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সোহেল রানা ও মনিষার এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে শেরপুর ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকার সহজ-সরল মানুষকে টার্গেট করে আসছে। তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বিদেশগামী কর্মীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং বিদেশে পাঠিয়ে তাদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। আকাশের মতো আরও অনেক প্রবাসী বর্তমানে এই চক্রের শিকার হয়ে বিদেশের মাটিতে জেল-জরিমানার মুখোমুখি হচ্ছেন।
প্রশাসনের কাছে দাবি
ভুক্তভোগী আকাশ ও তার পরিবার বাংলাদেশ সরকারের কাছে তিনটি দাবি জানিয়েছেন:
আইনি ব্যবস্থা: ঢাকা ও শেরপুরে সক্রিয় এই দালাল চক্রের সদস্যদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা।
ক্ষতিপূরণ: প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থ ফেরত এবং বিদেশে হওয়া ক্ষতির ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা।
নিরাপদ প্রত্যাবাসন বা কর্মসংস্থান: ভুক্তভোগী আকাশকে বৈধ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া অথবা নিরাপদভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, যদি এখনই এই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার পাশাপাশি আরও শত শত প্রাণ অকালে ঝরে যেতে পারে।
নিউজ ডেস্ক
তদন্ত অব্যাহত…