কালিগঞ্জে রাজনৈতিক বিতর্ক ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
কঠোর অভিযানের দাবিতে সরব নাগরিক সমাজ
বিশেষ প্রতিনিধি | কালিগঞ্জ
কালিগঞ্জ উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে এক সাবেক রাজনৈতিক নেতাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ নিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কয়েকজন বাসিন্দা ও দলীয় সূত্রের দাবি, গত ৫ আগস্টের পর এলাকায় প্রভাব খাটানো, অর্থ আদায় ও অনিয়মের অভিযোগে তার নাম উঠে আসে।
সূত্রগুলো জানায়, তিনি পূর্বে উপজেলা পর্যায়ের একটি সহযোগী সংগঠনের দায়িত্বে ছিলেন এবং পরবর্তীতে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কৃত হন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কিছু ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ প্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে বলে তারা দাবি করেন।
তবে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত মন্তব্য করা সমীচীন নয়।
ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক প্রভাব
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ কোনো দলের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তারা বলেন, ব্যক্তি পর্যায়ের বিতর্ক দলীয় অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে যদি দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত না হয়।
তাদের অভিমত, অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা যেমন জরুরি, তেমনি প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী সাব্যস্ত করাও অনুচিত।
চাঁদাবাজি দমনে কঠোর পদক্ষেপের জোর দাবি
‘অপারেশন ক্লিন হাট’-এর আদলে সমন্বিত অভিযানের আহ্বান
এদিকে কালিগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় বাজার, হাট-বাজার ও পরিবহন খাতে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ বাড়ছে বলে ব্যবসায়ী মহল দাবি করেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, অনিয়মিত অর্থ আদায়ের চাপ তাদের ব্যবসা পরিচালনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং পণ্যের দামে অস্থিরতা তৈরি করছে।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবেলায় অতীতে পরিচালিত বিশেষ অভিযানের মতো কঠোর ও লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তারা প্রস্তাব করেন—
নিয়মিত যৌথ অভিযান ও নজরদারি
গোপন অভিযোগ গ্রহণের নিরাপদ ব্যবস্থা
দ্রুত তদন্ত ও দৃশ্যমান আইনগত পদক্ষেপ
বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, লিখিত অভিযোগ ও সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। “আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়”—বলেন তিনি।
জনমতের বার্তা
সুশাসনকর্মীরা মনে করেন, শুধু অভিযান নয়—প্রশাসনিক জবাবদিহি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনসচেতনতার সমন্বিত প্রয়াসই পারে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের মাধ্যমে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিভ্রান্তির অবসান ঘটবে এবং বাজারে স্বস্তি ফিরবে।

কালিগঞ্জ কালিগঞ্জ উপজেলায় এক সময়ের ছাত্রশিবির নেতা ও পরবর্তীতে বিএনপি ঘরানার রাজনীতিতে অনুপ্রবেশকারী রোকনুজ্জামানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, লুটপাট এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের পাহাড়সম অভিযোগ উঠেছে। নৈতিক স্খলন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায়ে একাধিকবার দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও এলাকায় তার দাপট কমেনি। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী—সবাই এখন এই ‘ভোল্ট পাল্টানো’ নেতার অত্যাচারে দিশেহারা।
নৈতিক স্খলনে ছাত্রশিবির থেকে বিদায়
অনুসন্ধানে জানা যায়, রোকনুজ্জামান একসময় ইসলামী ছাত্রশিবিরের কালিগঞ্জ উপজেলা শাখার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে (সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক) ছিলেন। তবে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে প্রথম বড় ধাক্কা আসে এক প্রবাসীর স্ত্রীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত অবস্থায় হাতেনাতে ধরা পড়ার পর। এই ঘটনার পর নৈতিক স্খলনের দায়ে ছাত্রশিবির তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে।
বিএনপিতে অনুপ্রবেশ ও পদ বাগিয়ে নেওয়া
শিবির থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর নিজের অপরাধ আড়াল করতে রোকনুজ্জামান খোলস পাল্টান। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সহযোগী সংগঠন কৃষক দলে যোগ দেন। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং কৌশলে তিনি কালিগঞ্জ উপজেলা কৃষক দলের আহবায়ক পদটি বাগিয়ে নিতে সক্ষম হন। তার এই আকস্মিক উত্থানে তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মাঝে তখন থেকেই চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছিল।
৫ই আগস্ট পরবর্তী তাণ্ডব ও দলীয় বহিষ্কার
গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে রোকনুজ্জামান আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় তিনি ও তার অনুসারীরা ব্যাপক চাঁদাবাজি, ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট শুরু করেন। বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতাদের নজরে এলে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে।
সন্ত্রাসের টাকায় ‘ভুট্টার মিল’ ও বিপুল সম্পদ
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরও রোকনুজ্জামানের দাপট কমেনি। বরং তিনি এলাকায় একটি নিজস্ব বাহিনী গড়ে তুলেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ী জানান, “রোকনুজ্জামানের কথায় কান না দিলে ব্যবসা করা কঠিন।” এই চাঁদাবাজি ও লুটপাটের অর্থ দিয়ে তিনি রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। যার মধ্যে অন্যতম একটি বড় ভুট্টার মিল। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—একজন সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী থেকে মাত্র কয়েক বছরে এত বড় মিল ও সম্পদের মালিক তিনি কীভাবে হলেন?
নিরাপত্তাহীনতায় সাধারণ মানুষ
বর্তমানে রোকনুজ্জামানের ভয়ে কালিগঞ্জের সাধারণ মানুষ কথা বলতে সাহস পায় না। তার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, “তিনি যখন যে দল ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা থাকে, সেই দলের নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম করেন। অথচ তার সাথে এখন দলের কোনো সম্পর্ক নেই।”
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা
রোকনুজ্জামানের এই অবৈধ সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে এবং তার অর্জিত সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন কালিগঞ্জবাসী। সাধারণ মানুষের দাবি, এই চিহ্নিত সন্ত্রাসীকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক, যাতে এলাকায় শান্তি ফিরে আসে।