বিআইডব্লিউটিএ–এ ঘুষ-দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তোলা প্রধান প্রকৌশলী (মেরিন) মোঃ আতাহার আলী সরদার
সরকারের জিরো টলারেন্স নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি, ঠিকাদারি খাতে অন্ধকার সিন্ডিকেটের ভয়ঙ্কর দৌরাত্ম্য
নিজস্ব অনুসন্ধান প্রতিবেদক : সোহেল রানা
ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে রূপান্তরের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে বহু আগে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য—বিআইডব্লিউটিএর মেরিন শাখার প্রধান প্রকৌশলী (মেরিন) মোঃ আতাহার আলী সরদার এই নীতি ও রাষ্ট্রীয় নির্দেশনাকে প্রকাশ্যে উপহাস করে নিজের চারপাশে গড়ে তুলেছেন ভয়ঙ্কর দুর্নীতির সাম্রাজ্য।
অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগের পর সহকারী প্রকৌশলী থেকে ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেলেও তার সমান্তরালে বেড়েছে ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যের ভয়ংকর নেটওয়ার্ক। রাজধানীর বিআইডব্লিউটিএ ভবনে তার এই দুর্নীতি আজ ওপেন সিক্রেট—যা জানেন না এমন কর্মকর্তা বা ঠিকাদার খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
বহু ঠিকাদার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শর্তে জানিয়েছেন, আতাহার আলী সরদার স্যারের কাছে কাজ পেতে হলে ৫% থেকে ১৫% কমিশন দিতে হবে—এটাই তার নিয়ম। বড় কাজ হলে ৩০% থেকে ৪০% পর্যন্ত লভ্যাংশ দিতে হয়।
ই–জিপি ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাজ বণ্টন
সরকার ঠিকাদারি কাজে দুর্নীতি বন্ধে চালু করেছে ই–জিপি পদ্ধতি। কিন্তু কথায় আছে—চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনী।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, টেন্ডার আহ্বানের পর কোন ঠিকাদার কোন রেটে দরপত্র দিচ্ছে—সেই গোপন তথ্য তিনি আগেভাগেই সরবরাহ করেন তার ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের কাছে। ফলে যারা ঘুষ দেয় না, তারা নিয়ম মেনে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও কাজ পায় না।
এক ঠিকাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্যারের চাহিদা মতো টাকা দিতে না পারলে ই–জিপি দিয়ে শতবার দরপত্র দিলেও কাজ পাবো না—এটা সবাই জানে।
আরেকজন বলেন, ৫% থেকে ১৫% ঘুষ দিয়েও শেষ হয় না; বিল পাস করতে চাইলে আবার ঘুষ দিতে হয়। না দিলে মাসের পর মাস বিল আটকে থাকে।
রেস্টুরেন্টে কমিশন বাণিজ্যের গোপন বৈঠক
বহু ঠিকাদার জানান, রাজধানীর বিভিন্ন বিলাসবহুল রেস্টুরেন্টে প্রায়ই দেখা যায় এই প্রধান প্রকৌশলীকে। সেখানে ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের সাথে হয় কমিশন বাণিজ্যের রফাদফা। খুব কম লোকই গোপন এই বৈঠকে প্রবেশাধিকার পান—তারা সাধারণত অগ্রিম ঘুষ দিয়ে বিশেষ তালিকায় থাকেন।
এক ঠিকাদারের ভাষায়, সামুদ্রিক বড় মাছ, কচি ষাঁড়ের গরুর মাংস, পদ্মার ডিমওয়ালা ইলিশ—এসব স্যারের খুব পছন্দ। কাজ পাওয়ার জন্য এগুলো পর্যন্ত স্যারের বাসায় পৌঁছে দিতে হয়।
মন্ত্রণালয়ের নাম ভাঙিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল
অভিযোগ আছে, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী এবং এপিএসের নাম ভাঙিয়ে তিনি নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দিয়ে থাকেন। এতে একদিকে মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে, অন্যদিকে এমএমই শাখায় গড়ে উঠছে শক্তিশালী দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট।
এক ঠিকাদার বলেন, আতাহার আলী স্যার শুধু ঘুষ নেন না, নিজের অধীনস্থ প্রকৌশলীদের দিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। এই সিন্ডিকেট ছাড়া বিআইডব্লিটিএ ভবনে কোনো কাজ পাওয়া অসম্ভব।
নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড়—অর্থের উৎস কোথায়
অভিযোগ রয়েছে, বহু বছর ধরে ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে গড়ে তোলা সম্পদের পরিমাণ কয়েক শ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। নামে–বেনামে জমি, প্লট, বাড়ি, বিলাসবহুল গাড়ি—এসবের উৎস তদন্ত করলে প্রকাশ পাবে প্রকৃত চিত্র।
—
আইনের চোখে এই অপরাধের শাস্তি
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪
ঘুষ গ্রহণ বা অবৈধ সম্পদ অর্জন প্রমাণিত হলে
১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অবৈধ সম্পদ জব্দ।
ফৌজদারি দণ্ডবিধি
সরকারি কর্মচারীর ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার বা কমিশন বাণিজ্য করলে
৩ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানা।
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন
অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বিনিয়োগ বা স্থানান্তর করলে
৭ বছর থেকে আজীবন কারাদণ্ড এবং সব সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত।
সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা বিধিমালা
দোষ প্রমাণিত হলে
চাকরি বহিষ্কার, পদাবনতি, অবসর সুবিধা বাতিলসহ কঠোর শাস্তি।
দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ
বহু ঠিকাদার বলেন, জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে নিচের স্তরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। তাদের মতে, আতাহার আলী সরদার সেই তালিকার শীর্ষে।
তাদের দাবি, গোয়েন্দা সংস্থা যদি প্রকৃত তদন্ত করে, এই সিন্ডিকেট একদিনেই ধ্বসে পড়বে। তখন বেরিয়ে আসবে বহু বছরের লুকানো দুর্নীতির চিত্র।
—
প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা
প্রধান প্রকৌশলী (মেরিন) মোঃ আতাহার আলী সরদার এর কাছে জানতে—
একাধিকবার ফোন করা হয়েছে
এসএমএস পাঠানো হয়েছে
ই-মেইল পাঠানো হয়েছে
কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বিআইডব্লিউটিএ দেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌসংস্থাগুলোর অন্যতম। সেখানে দায়িত্বে থাকা একজন প্রধান প্রকৌশলীর এভাবে দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তোলা শুধু প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়—এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও জনগণের অর্থের সরাসরি লুট।
স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে এমএমই শাখায় গড়ে ওঠা দুর্নীতির এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে—যেন ভবিষ্যতে কেউ রাষ্ট্রের সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পদ মনে না করে।