তারিখ: ৫ আগস্ট ২০২৫, সময়: ১:৩৮ রাত
জনতার কণ্ঠস্বর ডেস্ক : বেনাপোল প্রতিনিধি
১৫ বছরে বেনাপোল সীমান্তে ৭৯টি ধর্ষণ, ধামাচাপা দিতে হত্যা ৪: বিচারহীনতার কালো ছায়া
যশোরের বেনাপোল সীমান্তবর্তী শার্শা উপজেলায় বিচারহীনতার ভয়ংকর সংস্কৃতি আজও তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। গত ১৫ বছরে এই অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছে কমপক্ষে ৭৯টি ধর্ষণের ঘটনা, যার মধ্যে ৪ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছেন। অধিকাংশ মামলাতেই আসামিরা জামিনে মুক্তি পেয়ে ফের সমাজে বিচরণ করছে—আর ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আজো ন্যায়বিচারের আশায় হতাশায় পুড়ে চলেছে।
ধর্ষণ-হত্যা ও ক্ষমতার দাপট: কাজল রেখা হত্যা মামলা
২০১০ সালের আলোচিত গয়ড়া গ্রামের কাজল রেখা হত্যাকাণ্ড আজো শার্শার মানুষের মনে ক্ষোভ ও দুঃখের প্রতীক। চৌকিদার নবিচ্ছদির কিশোরী মেয়ে কাজল রেখাকে সম্পত্তির বিরোধে প্রতিবেশী যুবলীগ নেতা ওহিদুল ইসলাম এবং তার সহযোগী মিয়াদ আলী, নেদা মিলে গণধর্ষণ করে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে মাঠে ফেলে দেয়। মামলা দায়ের করেছিলেন তার পিতা নবিচ্ছদি, কিন্তু কয়েক দিনের মাথায় জীবননাশের হুমকিতে মামলাটি তুলতে বাধ্য হন। এখন সেই বাবা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে কেবল একটি আকুতি করেন—“আমার মেয়ের বিচার চাই।”
নৃশংসতার ধারাবাহিকতা: শিশু সেলিনা, কিশোর শাহপরান ও আর্জিনার পরিণতি
২০১৪ সালের ২৭ মে বসতপুরে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী সেলিনা খাতুনকে তারই প্রতিবেশী জাকির ও চার সহযোগী গণধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করে। লাশ খালে ফেলে দেয়। আসামিরা গ্রেপ্তার হলেও বছর না ঘুরতেই জামিনে মুক্তি পায়।
২০১৯ সালের ১২ জুন কাগজপুকুরের কিশোর শাহপরান হাফেজ হাফিজুর রহমানের যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। পরে তাকে হত্যা করা হয়। জামিনে ফিরে আসা হাফিজুর এখন এলাকায় ঘুরে বেড়ায়—আর শাহপরানের বাবা শুধু বলেন, “টাকা দিতে পারিনি, তাই বিচারও পেলাম না।”
২০১৪ সালের ২৫ জুলাই স্বরূপদাহ গ্রামের মাদ্রাসা ছাত্রী আর্জিনা খাতুনকেও ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ ওঠে, কিন্তু সেই মামলারও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনের ভাষ্য
যশোর জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নুরে আলম সিদ্দীকি বলেন, “ভুক্তভোগীরা চাইলে পুলিশ সবধরনের আইনি সহায়তা দিতে প্রস্তুত।” তবে তিনি স্বীকার করেন যে, “আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতামূলক কাজ জরুরি।”
রাইটস যশোর-এর নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মণ্ডল বলছেন, “বিচারহীনতার সংস্কৃতিই ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধকে উসকে দিচ্ছে। রাজনীতি ও প্রশাসনে প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ না থামলে অপরাধ কমবে না।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ ও বিএনপির অবস্থান
শার্শা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হাসান জহীর বলেন, “বিগত সরকারের শাসনামলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে বিএনপি পরিবারের অনেকেই এমন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আমাদের দল এসব নির্যাতিত পরিবারকে আইনি সহায়তা দিতে পাশে থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই বিচারহীনতা সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে পারে—শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার।”
সংখ্যা ও পরিসংখ্যান: একটি লজ্জার দলিল
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শার্শা উপজেলায় দায়ের করা ৭৯টি ধর্ষণ মামলার মধ্যে ৪৮টি শার্শা থানায়, এবং ৩১টি বেনাপোল পোর্ট থানায় হয়েছে। এসব মামলায় শতাধিক আসামি হলেও প্রায় সবাই জামিনে মুক্তি পেয়েছে, যা বিচারব্যবস্থার সংকট এবং তদন্তের দুর্বলতার নগ্ন উদাহরণ।
নতুন সময়ের নতুন প্রশ্ন?
শার্শা-বেনাপোল অঞ্চলের মা-বোনেরা কি শুধু রাজনৈতিক শোভাযাত্রার জন্য? নাকি এদেশে কোনো মা তার কিশোরী মেয়েকে শান্তিতে স্কুলে পাঠাতে পারবে? বর্তমান সরকারের কাছে এখন সময় এসেছে এই দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে যথাযথ বিচার নিশ্চিত করার।
কারণ, বিচার না হলে প্রতিরোধ আসবেই—এবার হয়তো পথে, হয়তো রাস্তায়, কিংবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও।