লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিজানুর রহমান শামীম-এর বর্ণাঢ্য এবং গৌরবময় সামরিক জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি বিস্তারিত এবং বিশেষ সংবাদ প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো:
এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মহাপ্রস্থান: দেশপ্রেম ও বীরত্বের মূর্ত প্রতীক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিজানুর রহমান শামীম-এর অবসর
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে কিছু নাম কেবল পদমর্যাদার কারণে নয়, বরং তাঁদের কর্ম, সততা এবং অদম্য দেশপ্রেমের কারণে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে। তেমনই এক কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিজানুর রহমান শামীম, বিপি, ওএসপি, এনডিসি, পিএসসি। দীর্ঘ চার দশকের এক অবিস্মরণীয় সামরিক যাত্রার ইতি টেনে তিনি সম্প্রতি অবসরে গিয়েছেন। তাঁর এই অবসর কেবল একটি পেশাদার জীবনের সমাপ্তি নয়, বরং বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ইতিহাসে একটি গৌরবময় অধ্যায়ের পূর্ণতা।
বীরত্বগাথা ও রণক্ষেত্রের নায়ক
১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির ১৩তম দীর্ঘমেয়াদী কোর্সের মাধ্যমে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কমিশন লাভ করেন তিনি। শুরু থেকেই তিনি ছিলেন একজন সম্মুখসারির যোদ্ধা। পার্বত্য চট্টগ্রামে দেশমাতৃকার অখণ্ডতা রক্ষায় তাঁর অসামান্য সাহসিকতা ও রণকৌশল আজও নবীন কর্মকর্তাদের অনুপ্রেরণা দেয়। তাঁর এই অনন্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্র তাঁকে তৃতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক পদক ‘বীর প্রতীক’ (BP)-এ ভূষিত করে। একজন পেশাদার সৈনিকের কাছে এর চেয়ে বড় সম্মান আর কিছু হতে পারে না।
নেতৃত্বের সুউচ্চ শিখরে
লেফটেন্যান্ট জেনারেল শামীম তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে প্রতিটি স্তরেই শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত সফলতার সাথে নেতৃত্ব দিয়েছেন:
২৬ বীর ও ৫৯ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট: যেখানে তিনি একজন আদর্শ কমান্ডিং অফিসার হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
১১১ পদাতিক ব্রিগেড: যার কমান্ডিং অফিসার হিসেবে তিনি দক্ষতার পরিচয় দেন।
২৪ ও ৯ পদাতিক ডিভিশন: সাভার ও চট্টগ্রামের জিওসি (GOC) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমূল পরিবর্তন আনেন।
আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট (ASU): দেশের অভ্যন্তরীণ ও বাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও কঠোর।
জাতীয় নিরাপত্তা ও আনসার বাহিনীর রূপকার
সামরিক বাহিনীর গণ্ডি পেরিয়ে তিনি জাতীয় পর্যায়েও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (NSI)-এর পরিচালক হিসেবে দেশের গোয়েন্দা কাঠামোকে শক্তিশালী করতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। পরবর্তীতে বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি-র মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি এই বাহিনীকে একটি সুশৃঙ্খল ও আধুনিক বাহিনীতে রূপান্তর করেন। তাঁর মানবিক নেতৃত্ব আনসার সদস্যদের মনোবল বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
চূড়ান্ত শিখর: পিএসও এবং সিজিএস
কর্মজীবনের শেষ ভাগে তিনি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (PSO) এবং পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ চিফ অব জেনারেল স্টাফ (CGS) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪-এর ক্রান্তিলগ্নে এবং ২০২৬-এর এই সময় পর্যন্ত সেনাবাহিনীর চেইন অফ কমান্ড এবং দেশীয় নিরাপত্তা অটুট রাখতে তিনি যে ধীরস্থির ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা জাতি চিরকাল কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করবে।
ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ: অনুকরণীয় এক চরিত্র
লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিজানুর রহমান শামীম কেবল একজন তুখোড় জেনারেলই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন নির্লোভ, নিরহংকার এবং সদালাপী মানুষ। ‘নীরবে কাজ করা এবং দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়া’—এই নীতিতেই তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর অধীনস্থ সৈনিকদের কাছে তিনি ছিলেন বড় ভাইয়ের মতো, আর উর্ধ্বতনদের কাছে ছিলেন আস্থার এক অটল দুর্গ। সততা ও শৃঙ্খলার সাথে কীভাবে দেশপ্রেমকে মেলাতে হয়, তা তিনি শিখিয়ে গেছেন।
বিদায়ী শ্রদ্ধা
আজ তিনি সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম ছেড়েছেন, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ ও কর্মপদ্ধতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতিটি ইউনিটে চিরকাল জীবিত থাকবে। তাঁর অবসরের মাধ্যমে সেনাবাহিনী একজন অভিভাবককে হারালো, কিন্তু দেশ পেল এক জীবন্ত কিংবদন্তিকে।
প্রার্থনা: মহান সৃষ্টিকর্তা এই বীর মুক্তিযোদ্ধার উত্তরসূরিকে তাঁর অবসর জীবনে সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু এবং পরম শান্তি দান করুন। দেশ ও জাতি আপনার কাছে চিরঋণী থাকবে, স্যার। আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ হোক আগামীর প্রজন্মের জন্য আলোকবর্তিকা।