যশোর-১ আসনে মনোনয়ন বিতর্কে তোলপাড় বিএনপি: তৃণমূলের দাবি—ত্যাগী নেতা নুরুজ্জামান লিটনকে ফিরিয়ে আনুন
বেনাপোল প্রতিনিধি: আলমগীর হোসেন
তারিখ: ১০ নভেম্বর ২০২৫ | সময়: বিকাল ৪:৫৩ মিনিট | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ ডেস্ক রিপোর্ট
—
যশোর-১ (শার্শা) আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে স্থানীয় রাজনীতিতে। দলের প্রাথমিক প্রার্থী তালিকায় শার্শা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও ত্যাগী নেতা আলহাজ নুরুজ্জামান লিটনের নাম বাদ পড়ায় তৃণমূলের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক ক্ষোভ, হতাশা ও প্রতিবাদের সুর।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ৩ নভেম্বর সারাদেশের ২৩৭টি আসনের প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেন। সেখানে যশোর-১ আসনে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয় দলের কেন্দ্রীয় সাবেক দপ্তর সম্পাদক ও একসময়ের সংস্কারপন্থি নেতা মফিকুল হাসান তৃপ্তির নাম।
এই ঘোষণার পর থেকেই শার্শা-বেনাপোলসহ পুরো এলাকায় বিএনপির তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে নেমে আসে হতাশা ও অসন্তোষের ঢেউ।
তৃণমূলের ক্ষোভ: “দুঃসময়ের সৈনিককে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে”
স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ— দলের দুঃসময়ে যখন অধিকাংশ নেতা মাঠ ছেড়ে ছিলেন, তখন নুরুজ্জামান লিটন ছিলেন শার্শা বিএনপির প্রাণভোমরা।
তার নামে রয়েছে ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক মামলা, একাধিকবার জেল খেটেছেন, কিন্তু কখনোই দলত্যাগ বা আপস করেননি।
তিনি টানা ১৭ বছর ধরে মাঠে থেকে সংগঠনকে বাঁচিয়ে রেখেছেন— দলীয় কর্মীদের পাশে ছিলেন আন্দোলন, মামলা-মোকদ্দমা ও প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তে।
শার্শার একাধিক ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতারা জানান, নুরুজ্জামান লিটন শুধু রাজনীতিক নন, তিনি একজন মানবিক নেতা। দরিদ্র মানুষের পাশে থেকে শিক্ষা, চিকিৎসা ও মানবসেবায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। তার এই জনপ্রিয়তা এবং সততা তৃণমূলে তাকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
ছাত্র রাজনীতি থেকে বিএনপির মূলধারায়
নুরুজ্জামান লিটনের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৮ সালে ছাত্রদলে যোগদানের মাধ্যমে।
পরের বছরই তিনি শার্শা উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হন। পরবর্তী সময়ে দুই মেয়াদে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দলের সংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করেন।
পরবর্তীতে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি, যুবদলের কেন্দ্রীয় সদস্য এবং খুলনা বিভাগের সহ-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০২২ সালে তাকে কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি শার্শা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং উপজেলা পর্যায়ে দলের অন্যতম মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত।
করোনা ও বন্যায় মানবিক সহায়তার মুখ নুরুজ্জামান লিটন
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তারেক রহমানের নির্দেশে ২০২০ সালে যখন সারাদেশে যুবদল পুনর্গঠন শুরু হয়, তখন খুলনা বিভাগে সংগঠন পুনরুজ্জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন নুরুজ্জামান লিটন।
করোনাকালীন সময় নিজের উদ্যোগে শত শত অসহায় পরিবারকে খাদ্য ও অর্থ সহায়তা দিয়েছেন তিনি। সাম্প্রতিক বন্যার সময়ও ত্রাণ কার্যক্রমে সরাসরি মাঠে ছিলেন।
বেনাপোল বাজারের ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম বলেন,
> “লিটন ভাই শুধু নেতা নন, তিনি এলাকার মানুষের অভিভাবক। আমরা বিএনপি করি না, কিন্তু তার মানবিক ব্যবহারে সবাই মুগ্ধ।”
স্থানীয়দের প্রত্যাশা ও আবেগ
স্থানীয় প্রবীণ নেতা সিরাজুল ইসলাম সিরাজ বলেন,
> “নুরুজ্জামান লিটন ছাড়া শার্শা বিএনপিকে কল্পনা করা যায় না। তিনি দলে নিষ্ঠাবান, ত্যাগী এবং নির্লোভ একজন নেতা। দলের সঠিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হলে তাকেই প্রার্থী করা উচিত।”
পুতাপাড়া এলাকার কৃষক সাইদুজ্জামান বলেন,
> “লিটন ভাইয়ের মতো নেতাই এখন দরকার, যিনি মাঠে থাকেন, মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়ান। তাকে বাদ দিলে সংগঠন ভেঙে পড়বে।”
বেনাপোলের গৃহবধূ সুরাইয়া খাতুন বলেন,
> “আমরা রাজনীতি বুঝি না, কিন্তু লিটন ভাই আমাদের পাশে ছিলেন, গরিবদের সাহায্য করেছেন। তার নাম বাদ পড়ায় আমরা কষ্ট পেয়েছি।”
শার্শা উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা কামাল মিন্টু বলেন,
> “নুরুজ্জামান লিটন মাঠের নেতা। আন্দোলন, মিছিল, বা দলের সংকটে সবার আগে তিনি এগিয়ে আসেন। তৃণমূলের দাবি উপেক্ষা করলে সংগঠনের ক্ষতি হবে। আমরা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে মনোনয়ন পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানাচ্ছি।”
“তৃণমূলের অনুভূতিই দলের শক্তি”— নুরুজ্জামান লিটন
বিতর্কের বিষয়ে আলহাজ নুরুজ্জামান লিটন নিজেই বলেন,
> “আমি দলের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু আশা করি তারেক রহমান সাহেব তৃণমূলের আবেগ ও বাস্তবতা বিবেচনায় বিষয়টি পর্যালোচনা করবেন। বিএনপি ত্যাগী নেতাদের দল— আমি বিশ্বাস করি, যারা মাঠে ছিলেন, তাদের মূল্যায়ন একদিন হবেই।”
বিশ্লেষকরা যা বলছেন
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, যশোর-১ আসনে বিএনপি যদি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে চায়, তবে তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা ও স্থানীয় জনপ্রিয় নেতাদের মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন বিশ্লেষক বলেন,
> “লিটন দীর্ঘদিন ধরে মাঠে আছেন, তার বিরুদ্ধে কোনো বিতর্ক নেই। এমন নেতাদের অবমূল্যায়ন করলে বিএনপির সংগঠন দুর্বল হবে।”
শার্শার রাজনীতি আজ দুই ভাগে বিভক্ত— একপক্ষে কেন্দ্রীয় মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থী, অন্যপক্ষে মাঠের ত্যাগী কর্মীবান্ধব নেতা নুরুজ্জামান লিটন।
তৃণমূলের কণ্ঠে এখন একটাই দাবি—
“যে নেতা মাঠে ছিলেন, দলের বিপদে যিনি পাশে ছিলেন, তাকেই ফেরাতে হবে জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে।”