
যশোরের কেশবপুরে ৩ হাজার পরিবার পানিবন্দি: ভেঙে পড়েছে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, খাদ্য-চিকিৎসার সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত
প্রতিবেদন: হাফিজুর রহমান, কেশবপুর প্রতিনিধি
তারিখ: ১৫ জুলাই ২০২৫
যশোরের কেশবপুরে দীর্ঘদিনের নদী খনন অবহেলা, অপরিকল্পিত মাছ চাষ ও জলাশয় দখলের ফলে বর্ষার স্বাভাবিক বৃষ্টিতেই এবার ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে পৌরসভাসহ উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ। হরিহর ও বুড়িভদ্রা নদীর নাব্যতা হ্রাস, কচুরিপানায় বন্ধ হয়ে যাওয়া খাল-নালার কারণে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে প্রায় ৩ হাজার পরিবার বর্তমানে পানিবন্দি, তীব্র খাদ্য ও চিকিৎসা সংকটে দিন কাটাচ্ছেন তারা।
জলাবদ্ধতার পেছনে মূল কারণসমূহ:
- নদীর নাব্যতা হ্রাস: হরিহর, বুড়িভদ্রা ও আপারভদ্রা নদী দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় পলিতে ভরাট।
- অবৈজ্ঞানিক ঘের ব্যবসা: প্রায় ৪ শতাধিক অপরিকল্পিত মাছের ঘের জলাধার ও পানি চলাচলের পথ আটকে দিয়েছে।
- কচুরিপানা ও ময়লার স্তুপ: খাল, বিল ও নদী পাড়ে দীর্ঘদিন পরিস্কার না করায় পানি বেরোতে পারছে না।
বিপর্যস্ত জনজীবন:
➤ পানিতে ডুবে আছে:
- আলতাপোল, হাবাসপোল, ভবানিপুর, সাহাপাড়া, মধ্যকুল, ব্যাসডাঙ্গা, সুজাপুর ও রামচন্দ্রপুর।
- স্থানীয়দের কেউ কেউ বাড়ি ছেড়ে যশোর-সাতক্ষীরা মহাসড়কের ধারে আশ্রয় নিয়েছেন।
ভেসে গেছে:
কেশবপুরের পাইকারি কাঁচা বাজার, ধান হাট, হলুদ হাট ও প্রধান প্রধান সড়ক।
- স্থানীয় ব্যবসায়ী মাহাবুর রহমান জানান, বাজার ডুবে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা মাইকেল মোড়ে ব্যবসা স্থানান্তর করেছেন।
➤ মানবিক সংকট:
- খাবার, সুপেয় পানি, শিশু খাদ্য ও ওষুধের সংকট তীব্র।
- বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থরা চরম দুর্ভোগে।
কৃষিতে ভয়াবহ ক্ষতি:
উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে ধান, সবজি ও তিল চাষে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা।
উপজেলা কৃষি অফিসার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে।জ
জনপ্রতিনিধি ও দলের অভিযোগ:
- আব্দুল আলিম, বিএনপি নেতা বলেন:
“হাবাসপোল ও মধ্যকুল গ্রামে অধিকাংশ বাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে।”
- মেহেদী হাসান, যুবদল নেতা জানান:
“৫নং ওয়ার্ডে দেড় শতাধিক পরিবার এক সপ্তাহ ধরে পানিতে আটকে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ত্রাণ বা নিষ্কাশনের ব্যবস্থা হয়নি।”
- আলাউদ্দীন আলা, সদর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান বলেন:
“আমার ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রামে দুই শতাধিক পরিবার জলাবদ্ধতায় পড়েছে। প্রতিদিন অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে।”
প্রশাসনের গাফিলতি ও দায়বদ্ধতা:
- কেশবপুর পৌরসভার সচিব এনামুল হক জানান:
“২৫ শত পরিবার এখন পানিবন্দি। পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক।”
- কিন্তু উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সুমন সিকদারের মোবাইল বন্ধ থাকায় যোগাযোগ করা যায়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ত্রাণ বা জরুরি সহায়তা কার্যক্রম শুরু হয়নি।
দায় কার? উন্নয়ন কোথায়?
দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর ও সংস্থা:
- পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB): নদী খনন, পানি নিষ্কাশন ও পোল্ডার ব্যবস্থাপনা।
- কেশবপুর পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদসমূহ: ড্রেনেজ, কচুরিপানা পরিষ্কার, বাসিন্দাদের সহায়তা।
- উপজেলা প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি: ত্রাণ বিতরণ, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন।
- কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর: কৃষক ক্ষতিপূরণ ও বীজ সহায়তা।
- স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংসদ সদস্য: পরিস্থিতি মনিটরিং ও মন্ত্রণালয় পর্যায়ে তদবি
কেশবপুরের এ অবস্থা একটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীন উন্নয়নের ফল। সাময়িক পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ না নিলে আগামী দিনে এখানে মানবিক বিপর্যয় তৈরি হবে। অবিলম্বে জরুরি ভিত্তিতে নিচের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
- নদী খননের প্রকল্প বাস্তবায়ন
- ঘেরগুলোর পরিকল্পিত রূপান্তর ও অনুমোদনবিহীন ঘের উচ্ছেদ
- কচুরিপানা ও খাল-ড্রেন পরিষ্কার
- জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম
- ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ
এই সংকটের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই—জনগণের জীবন আজ রাষ্ট্রীয় অবহেলার জলে ডুবে আছে। এখনই জেগে না উঠলে আগামীতে কেশবপুর হবে একটি ডুবন্ত শহরের নাম।