বেনাপোলের ছাত্রলীগ নেতা আকুলের ভাই মুকুল গ্রেফতার: অপরাধ সাম্রাজ্যের অন্ধকার অধ্যায় উন্মোচিত
১৬ আগস্ট ২০২৫ | সময়: ১৫:৩৫
জনতার কণ্ঠস্বর ডেস্ক
যশোরের বেনাপোল পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ড, জিএম গোডাউন এলাকা থেকে রাত অনুমান সাড়ে ৩টার সময় ছাত্রলীগ নেতা এনামুল হক মুকুলকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বিএনপি নেতা আবেদুর রহমান বাদী হয়ে দায়েরকৃত বিশেষ ক্ষমতা আইনে রুজুকৃত মামলায় তাকে বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, এই গ্রেফতার কেবল একজন ব্যক্তির পতন নয়—বরং বেনাপোলের দীর্ঘদিনের অপরাধ সাম্রাজ্যের আংশিক উন্মোচন।
অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগ
বেনাপোল স্থলবন্দর ও আশপাশের এলাকায় চাঁদাবাজি, অবৈধ ব্যবসা, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং দুর্নীতির নেপথ্যে মুকুলের নাম ঘুরেফিরে আসে। স্থানীয়রা বলছেন—সে একা নয়, তার ভাই আকুল এবং প্রভাবশালী নেতা মেয়র আশরাফুল আলম লিটনের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই চক্র বছরের পর বছর বন্দরে দাপট দেখিয়েছে।
শ্রমিক খাবার আত্মসাৎ ও দুর্নীতি
বন্দরের শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবারের চাল-ডাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়মিতভাবে আত্মসাৎ করা হতো। শ্রমিকরা অভিযোগ করেন—প্রকৃত বরাদ্দের অর্ধেকও তাদের হাতে পৌঁছায় না। এক শ্রমিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা দিনরাত খাটি, কিন্তু যা উপার্জন করি তার অর্ধেকই চলে যায় প্রভাবশালীদের পকেটে।”
ট্রাক টোল ও চাঁদাবাজি
বন্দরে ঢোকা-বের হওয়া প্রতিটি ট্রাক থেকে নিয়মিত টোল আদায় করা হয়। এই টাকা রাষ্ট্রীয় খাতায় জমা হয় না, বরং সিন্ডিকেটের হাতে চলে যায়। ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন—“ট্রাক ঢোকাতে হলে টাকা দিতে হবে, না হলে পণ্য আটকে রাখা হবে।” এতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বিলম্ব হয় এবং ব্যবসার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
টেন্ডারবাজি ও ক্ষমতার খেলা
বন্দরের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও সরবরাহ চুক্তিতে সিন্ডিকেটের সরাসরি প্রভাব রয়েছে। মেয়র আশরাফুল আলম লিটনের ছত্রছায়ায় টেন্ডারবাজির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছে, তাদের ভয়-ভীতি, হামলা এবং সামাজিকভাবে হেয় করার ঘটনা ঘটেছে।
রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়
মুকুল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগের ক্ষমতার সময়ে ছাত্রলীগ পরিচয়কে ঢাল বানিয়ে তারা অপরাধের নানান কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। প্রশাসনের একাংশও তাদের প্রভাবের বাইরে ছিল না। ফলে অপরাধ সাম্রাজ্য আরও সুসংগঠিত হয়েছে।
সাধারণ মানুষের ক্ষোভ
স্থানীয়রা বলছেন—বেনাপোল বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হলেও এর লাভভাগ সাধারণ মানুষ পান না। শ্রমিকদের মজুরি হ্রাস করা হয়, ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত খরচে বিপদে পড়ে, অথচ সিন্ডিকেট কোটি কোটি টাকার সুবিধা ভোগ করে।
দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি
প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয় বেনাপোলে, কিন্তু এর বড় অংশ চলে যায় অপরাধী চক্রের হাতে। এতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এবং সাধারণ শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরাও চরম ভোগান্তিতে পড়ছে। এক ব্যবসায়ী বলেন—“আমাদের বৈধ ব্যবসা করার অধিকার নেই, আগে সিন্ডিকেটের অনুমতি নিতে হবে।”
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন—দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দরে যদি অপরাধ চক্র সক্রিয় থাকে, তবে তা দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে গভীর সংকটে ফেলবে। আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকরা মনে করেন—মুকুলের গ্রেফতার একটি শুরু হলেও আকুল–মুকুল–লিটনের পুরো সিন্ডিকেট ভাঙা না গেলে কোনো বাস্তব পরিবর্তন আসবে না।
বেনাপোল কেবল একটি বন্দর নয়, দেশের রাজস্ব আয়ের মূল উৎস। এখানে যদি দুর্নীতি ও অপরাধ অব্যাহত থাকে, তবে জাতীয় স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এনামুল হক মুকুলের গ্রেফতার নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ, তবে জনমতের প্রশ্ন—এটি কি কেবল প্রতীকী পদক্ষেপ, নাকি সত্যিই বেনাপোলকে অপরাধমুক্ত করার সূচনা?