শার্শা (যশোর) প্রতিনিধি / নিজস্ব প্রতিবেদক:
বিয়ে আর সংসারের পবিত্র সম্পর্ককে হাতিয়ার বানিয়ে সর্বস্বান্ত করা এক এক অভিনব ও ভয়াবহ প্রতারক চক্রের সন্ধান মিলেছে যশোরের শার্শা উপজেলার গোগা ইউনিয়নের হরিশ্চন্দ্রপুর গ্রামে। প্রতারণার এই জালে ফেঁসে কপাল পুড়েছে একাধিক প্রবাসী ও প্রবাসী পরিবারসহ ধনাঢ্য পরিবারের যুবকদের। চক্রের মূল হোতা হরিশ্চন্দ্রপুর গ্রামের ঝর্না খাতুন ও তার মেয়ে সাথী খাতুন। মা-মেয়ের গড়ে তোলা এই কৌশলগত চক্রটি একের পর এক বিয়ের নাটক সাজিয়ে লাখ লাখ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার হাতিয়ে নেওয়াই কেবল নয়, উল্টো ভুক্তভোগীদের ওপর মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কাবিনের টাকা আদায়ে বাধ্য করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রধান লক্ষ্য ধনাঢ্য পরিবার ও প্রবাসী যুবকেরা
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, চক্রটির প্রধান টার্গেট স্থানীয় বিত্তশালী পরিবার অথবা বিদেশে থাকা অবিবাহিত ও সহজ-সরল যুবকেরা। মা ঝর্না খাতুন কৌশলে মেয়ে সাথী খাতুনকে তাদের সামনে তুলে ধরেন এবং বিভিন্ন প্রলোভনে বিয়ের সম্পর্কে আবদ্ধ করেন। বিয়ের কিছুদিন যেতে না যেতেই শুরু হয় মানসিক নির্যাতন, বানোয়াট পারিবারিক কলহ এবং মিথ্যা অপবাদ। এক পর্যায়ে স্বামীকে সামাজিকভাবে হেয় করে জোরপূর্বক তালাক দিতে বাধ্য করা হয় এবং মোটা অঙ্কের কাবিন আদায় করে নামানো হয় পথে।
প্রতারণার শিকার তিন স্বামী, দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর তালিকা
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে মা-মেয়ে মিলে অন্তত তিনটি পরিবারের জীবন সম্পূর্ণ তছনছ করে দিয়েছে।

প্রথম শিকার মোরাদ হোসেন (২০১৫-২০১৯): কালিনি গোগা এলাকার বাসিন্দা মোরাদ হোসেনের সাথে প্রথমে বিয়ে দেওয়া হয় সাথী খাতুনকে। একটানা ৪ বছর সংসার করার পর বিভিন্ন কৌশল ও চাপ প্রয়োগ করে তার কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে মোরাদ হোসেনকে সামাজিকভাবে অপদস্থ করে সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও সর্বস্বান্ত করে বিদায় দেয় এই চক্র।
দ্বিতীয় শিকার প্রবাসী সিরাজুল ইসলাম (২০২০-২০২৩): কন্যদাহ গ্রামের প্রবাসী সিরাজুল ইসলামের সাথে ২০২০ সালে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অনলাইনে সাথীর দ্বিতীয় বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর স্বামী প্রবাসে থাকার সুযোগে প্রবাসীর কষ্টার্জিত টাকা হাতিয়ে নেওয়া শুরু হয়। নগদ ৪ লক্ষ টাকা এবং সাড়ে ৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার হাতিয়ে নেওয়ার পর ২০২৩ সালে তাকেও নানা বাহানায় সংসার ভাঙতে বাধ্য করা হয়।
তৃতীয় শিকার ইমরান খান (২০২৩-২০২৬): বেনাপোল চেকপোস্ট এলাকার বাসিন্দা ইমরান খানের ক্ষেত্রে প্রতারণার মাত্রা সব সীমা ছাড়িয়ে যায়। পূর্ববর্তী দুটি বিয়ের সমস্ত তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রেখে সাথীকে ‘কুমারী মেয়ে’ হিসেবে ইমরান খানের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, সাথীর গর্ভে সন্তান ধারণের সক্ষমতা নেই জেনেও ডাক্তারের চিকিৎসার দোহাই দিয়ে স্বামী ইমরানের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ খসানো হয়। পরবর্তীতে তাদের সংসারে নানা মিথ্যা অপবাদ এনে স্থানীয় বিচার-সালিসের মাধ্যমে আগের ২ লাখ টাকা কাবিনের জায়গায় আরও ৫০ হাজার টাকা বাড়িয়ে মোট ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আদায় করে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিঃস্ব করা হয়।
এলাকাবাসীর ক্ষোভ ও সতর্কতা
পর পর তিনটি সংসার ধ্বংস এবং মা-মেয়ের এই ব্ল্যাকমেইলিং ও কাবিন বাণিজ্যের নির্মম অভিজ্ঞতায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় সচেতন মহল। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত এই সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রটিকে আইনের আওতায় না আনলে ভবিষ্যতে আরও বহু সম্ভাবনাময় যুবকের জীবন ও পরিবার ধ্বংসের মুখে পড়বে।
এলাকাবাসীর জোর দাবি—সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি এই মা-মেয়ে চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, যাতে আর কোনো নিরপরাধ যুবক এদের প্রতারণার শিকার না হয়।