বিশেষ প্রতিনিধি, বেনাপোল:
সীমান্তের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দুর্যোগকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। যশোরের বেনাপোল পোর্ট থানাধীন সীমান্তবর্তী দৌলতপুর এলাকায় সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত, পানিবন্দী ও অসচ্ছল পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছে খুলনা ব্যাটালিয়ন (২১ বিজিবি)।
গত ১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোঃ নাফিজ ইমতিয়াজ আহসান সরেজমিনে উপস্থিত থেকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৭০টি গরিব ও অসহায় পরিবারের হাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী তুলে দেন।
দুর্যোগের কারণে যখন সীমান্তবর্তী এসব পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত, তখন প্রয়োজনের মুহূর্তে বিজিবির পক্ষ থেকে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিয়েছে।
বন্যায় বিপর্যস্ত সীমান্তবাসীর পাশে বিজিবি
সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা অনেকাংশেই প্রকৃতি ও স্থানীয় পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। অতিবৃষ্টি ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন নিম্নআয়ের মানুষ। অনেক পরিবারের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে এবং পানিবন্দি অবস্থায় দৈনন্দিন জীবনযাপনও দুরূহ হয়ে ওঠে।

দৌলতপুর সীমান্ত এলাকার এমন পরিস্থিতিতে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে খুলনা ব্যাটালিয়ন (২১ বিজিবি)। শুধু সীমান্ত পাহারা নয়, সংকটের সময়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে মানবিক দায়িত্ববোধ বিজিবির মধ্যে রয়েছে—এই উদ্যোগে তারই প্রতিফলন ঘটেছে।
৭০ পরিবারের হাতে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী
১৯ আগস্টের মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে দৌলতপুর এলাকার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৭০টি পরিবারের মাঝে বিভিন্ন ধরনের শুকনা খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়।
বিতরণ করা সামগ্রীর মধ্যে ছিল—
– চাল
– আটা
– চিনি
– ডাল
– সয়াবিন তেল
– লবণ
– অন্যান্য প্রয়োজনীয় শুকনা খাদ্যসামগ্রী
বন্যার সময়ে রান্না ও খাদ্যসংকট মোকাবিলায় এসব সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে সহায়ক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য দুর্যোগকালীন খাদ্য সহায়তা তাদের সাময়িক সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সরেজমিনে উপস্থিত অধিনায়ক
খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমে খুলনা ব্যাটালিয়ন (২১ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোঃ নাফিজ ইমতিয়াজ আহসান সরেজমিনে উপস্থিত ছিলেন।
তার উপস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের হাতে খাদ্যসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। এতে বিজিবির সদস্যদের সঙ্গে স্থানীয় অসহায় মানুষের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয় এবং দুর্যোগকবলিত মানুষের প্রয়োজন ও পরিস্থিতি কাছ থেকে পর্যবেক্ষণের সুযোগও সৃষ্টি হয়।
সীমান্তে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং দুর্যোগের সময়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জনকল্যাণমূলক ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
শুধু সীমান্তরক্ষা নয়, মানবিক দায়িত্বও
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ দেশের সীমান্ত সুরক্ষা, সীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধ এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দুর্যোগ ও মানবিক সংকটের সময়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নজিরও রয়েছে বাহিনীটির।
খুলনা ব্যাটালিয়ন (২১ বিজিবি)-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি যেকোনো দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে মানবিক সহায়তা নিয়ে দাঁড়ানোর কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
এমন উদ্যোগ সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ আরও শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখে। কারণ সীমান্তরক্ষী বাহিনী যখন নিরাপত্তার পাশাপাশি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তখন স্থানীয় জনগণের সঙ্গে বাহিনীর সম্পর্ক আরও গভীর হয়।
দুর্যোগে সহায়তা কেন গুরুত্বপূর্ণ
বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ। তাদের অনেকের ঘরবাড়ি পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কাজের সুযোগ কমে যায় এবং বাজার থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে শুকনা খাদ্যসামগ্রী দ্রুত পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রান্নার উপযোগী খাদ্যপণ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কয়েকদিনের জন্য হলেও একটি পরিবারকে সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে।
দৌলতপুরে ২১ বিজিবির খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমকে সেই মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবেই দেখছেন স্থানীয়রা।
সীমান্তবাসীর সঙ্গে বিজিবির সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার উদ্যোগ
সীমান্ত এলাকার মানুষের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সুসম্পর্ক সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা ও সচেতনতা সীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধেও সহায়ক হতে পারে।
ফলে জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড শুধু তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; দীর্ঘমেয়াদে সীমান্ত এলাকার জনগণের সঙ্গে বিজিবির পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরিতেও ভূমিকা রাখে।
দৌলতপুরে বন্যাকবলিত ৭০টি পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে ২১ বিজিবি সেই সম্পর্ককে আরও মানবিক ও জনমুখী করার একটি বার্তা দিয়েছে।
মানবিক উদ্যোগে স্বস্তি অসহায় পরিবারগুলোর
বন্যার পানি ও দুর্যোগের কারণে যখন অনেক পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত, তখন খাদ্যসামগ্রী হাতে পাওয়া তাদের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

স্থানীয় সীমান্তবাসীর জন্য এই সহায়তা হয়তো দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সম্পূর্ণ সমাধান নয়; তবে দুর্যোগের কঠিন সময়ে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া তাদের সাময়িক চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এ ধরনের উদ্যোগে শুধু খাদ্যসামগ্রী বিতরণই নয়, দুর্যোগের সময়ে অসহায় মানুষের পাশে কেউ আছে—এই মানসিক আশ্বাসও তৈরি হয়।
মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পথে এমন উদ্যোগের গুরুত্ব
প্রাকৃতিক দুর্যোগ কোনো ব্যক্তি, দল বা শ্রেণি দেখে আসে না। বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় কিংবা অন্যান্য দুর্যোগে সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষই আগে ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই দুর্যোগের সময়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজন।
দৌলতপুরে ২১ বিজিবির উদ্যোগ সেই সম্মিলিত মানবিক চেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সীমান্ত পাহারার দায়িত্বে থাকা সদস্যরা যখন অস্ত্র ও দায়িত্বের পাশাপাশি মানুষের দুর্দিনে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন, তখন নিরাপত্তার সঙ্গে মানবিকতার একটি শক্তিশালী বার্তাও পৌঁছে যায়।
ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে মানবিক কার্যক্রম
খুলনা ব্যাটালিয়ন (২১ বিজিবি)-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুর্যোগ ও মানবিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এ ধরনের কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
সীমান্তবর্তী দৌলতপুর এলাকার ৭০টি পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের এ উদ্যোগ তাই কেবল একটি ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচি নয়; বরং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রতি তাদের সামাজিক ও মানবিক দায়বদ্ধতার একটি প্রকাশ।
সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্যোগকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে “নিরাপত্তার সঙ্গে মানবিকতা”—এই বার্তাই যেন আরও স্পষ্ট করে তুলেছে খুলনা ব্যাটালিয়ন (২১ বিজিবি)।
প্রতিবেদন: বিশেষ প্রতিনিধি, বেনাপোল
প্রকাশনা: দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ