ফরিদপুরে সিজারের নামে চরম গাফিলতি: পেটে দেড় কেজি গজ রেখে সেলাই, ৫০ দিন পর প্রসূতির মৃত্যু; অবহেলা নাকি হত্যাকাণ্ড?
বিশেষ প্রতিবেদন :
হাসপাতালের ওয়েবসাইটে অস্তিত্বহীন এক “ভৌতিক ডাক্তার”, হোয়াটসঅ্যাপে ভুল স্বীকার, এবং ৩টি মাতৃহীন শিশু নিয়ে দিশেহারা স্বামী; হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গ্রেপ্তারের দাবিতে ক্ষোভ।
ফরিদপুর শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় প্রসূতির পেটে প্রায় দেড় কেজি ওজনের চিকিৎসাসামগ্রী (গজ) রেখে সেলাই করে দেওয়ার এক ভয়াবহ ও লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে। চরম অবহেলার শিকার হয়ে অস্ত্রোপচারের ১ মাস ২০ দিন (৫০ দিন) পর অবশেষে জীবনের সাথে যুদ্ধে হেরে গেলেন প্রসূতি কনিকা মন্ডল (৩৫)।

বুধবার দিবাগত রাত সোয়া ২টার দিকে ঢাকার কল্যাণপুর ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এই অপেশাদার ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণে একটি পরিবার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং মাতৃহীন হয়ে পড়েছে দুই মাসের এক নবজাতকসহ তিনটি অবুঝ শিশু।
এক ‘ভৌতিক ডাক্তার’? ওয়েবসাইটে তথ্য শূন্য ও যোগ্যতায় প্রশ্ন
অনুসন্ধানে এই মর্মান্তিক ঘটনার এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ‘ফরিদপুর সমরিতা জেনারেল হাসপাতাল’-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ঘেঁটে ডা. লক্ষী রানী দত্তের কোনো অস্তিত্ব বা তথ্য পাওয়া যায়নি।
ওয়েবসাইটে যেখানে তাঁর প্রোফাইল এবং ছবি থাকার কথা, সেই জায়গাটি সম্পূর্ণ ফাঁকা। হাসপাতালের ওয়েবসাইটে তাঁর সম্পর্কে বিন্দুমাত্র কোনো তথ্য নেই। প্রশ্ন উঠেছে, একজন তথাকথিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিজের কর্মস্থলেই কোনো ডিজিটাল পদচিহ্ন নেই কীভাবে?
ভেতরের সূত্র থেকে অভিযোগ উঠেছে যে, শুধুমাত্র একটি নাম এবং একটি সাধারণ ভিজিটিং কার্ড বা আইডি কার্ডের ওপর ভিত্তি করেই তাঁকে অপারেশন করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এখানে একটি গুরুতর প্রশ্ন থেকে যায়: সমরিতা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কীভাবে এমন একজনকে নিয়োগ দিল, যিনি মানব রূপী এক “পেশাদার কসাই”?
প্রশাসনের উচিত অবিলম্বে ডা. লক্ষী রানীর মেডিকেল সার্টিফিকেট, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং সমস্ত প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস জব্দ করে যাচাই করা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই এই দায় এড়াতে পারে না; যাচাই-বাছাইহীন এক ভৌতিক চিকিৎসকের হাতে গর্ভবতী মায়েদের তুলে দেওয়ার জবাব তাদের দিতেই হবে।
ঘটনার কালপঞ্জি: অস্ত্রোপচার থেকে মৃত্যুযন্ত্রণা
* **২৯ জুন ২০২৬:** অশান্ত মন্ডল তাঁর গর্ভবতী স্ত্রী কনিকা মন্ডলকে ফরিদপুরের **‘ফরিদপুর সমরিতা জেনারেল হাসপাতাল লিমিটেড’**-এ ভর্তি করান।
* **মারাত্মক ভুল:** ওইদিন সন্ধ্যায় ডা. লক্ষী রানী দত্ত সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করেন। তবে অস্ত্রোপচার শেষে পেটের ভেতর রাখা ‘সার্জিক্যাল গজ’ বের না করেই পেট সেলাই করে দেওয়া হয়।
* **শারীরিক অবক্ষয়:** পরদিনই কনিকার পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠে এবং তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়। অবস্থার অবনতি হলে ৩ জুলাই তাঁকে ঢাকার কল্যাণপুর ইবনে সিনা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
* **দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার ও গজ উদ্ধার:** ৭ জুলাই আলট্রাসনোগ্রাফি ও সিটি স্ক্যানে পেটের ভেতরে বিদেশি বস্তু ধরা পড়ে। জরুরি অস্ত্রোপচার চালিয়ে প্রায় **দেড় কেজি ওজনের পচে যাওয়া সার্জিক্যাল গজ** বের করা হয়।
* **করুণ পরিণতি:** দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ইনফেকশনের সাথে লড়াই করে অবশেষে ১৯ আগস্ট রাতে কনিকা মন্ডলের মৃত্যু হয়।
হোয়াটসঅ্যাপে ‘পাপস্বীকার’ ও গা ঢাকা
ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. লক্ষী রানী দত্ত নিহতের স্বামীর হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে নিজের গুরুতর ভুলের কথা স্বীকার করেন:
> *”দাদা নমস্কার। ভালো থাকুন ঈশ্বরের কাছে সেই প্রার্থনা করি। সব কথার আগে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থী। ভুল মানুষেরই হয়, অনেক ঝামেলার ভিতর থেকে আমি ভুল করে ফেলেছি। আমি বারবার ক্ষমা প্রার্থী আপনার কাছে। আমি অনেক কষ্টে আছি। আবারও ক্ষমা চাচ্ছি দাদা।”*
তবে পরবর্তীতে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি **”আমার খেয়াল নেই, একটু পরে ফোন দিচ্ছি”** বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও দায়িত্বশীল কোনো বক্তব্য দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
“তিনটি মাতৃহীন শিশু নিয়ে আমি কোথায় যাব?”
নিহত কনিকার স্বামী অশান্ত মন্ডল শোকে পাথর। সদ্যজাত দুই মাসের কন্যাসন্তান এবং আরও দুটি ছোট ছেলেকে বুকে জড়িয়ে তিনি বলেন:
চিকিৎসকের একটা ভুলের কারণে আমার সংসারটা ধ্বংস হয়ে গেল। মাত্র দুই মাসের একটা অবুঝ শিশু আজ মায়ের দুধ থেকে বঞ্চিত। ছোট তিনটি বাচ্চা নিয়ে আমি কীভাবে বাঁচব? আমি সরকারের কাছে এই ঘাতক ডাক্তারের সনদ বাতিল ও দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসির দাবি জানাচ্ছি।”

নাগরিক সমাজ ও সচেতন মহলের দাবি
ক্লিনিকের ব্যবসায়িক মানসিকতা এবং যাচাইবিহীন চিকিৎসকের অবহেলার বলি হয়ে একজন সুস্থ স্বাভাবিক প্রসূতির এমন মৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জনদাবিগুলো হলো:
১. **অবিলম্বে গ্রেপ্তার:** অভিযুক্ত ডা. লক্ষী রানী দত্ত ও সমরিতা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ৩০৪(ক) ধারায় ফৌজদারি মামলা দায়ের করে তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে।
২. **সনদ যাচাই:** ডা. লক্ষী রানী দত্তের শিক্ষাগত যোগ্যতা, মেডিকেল সার্টিফিকেট এবং বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশনের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করতে হবে।
৩. **হাসপাতাল সিলগালা:** স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক ফরিদপুর সমরিতা জেনারেল হাসপাতালের লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত বা সম্পূর্ণ সিলগালা করতে হবে।
৪. **আর্থিক ক্ষতিপূরণ:** নিহতের অবুঝ তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সর্বোচ্চ আর্থিক ক্ষতিপূরণ আদায় করে দিতে হবে।
প্রশাসন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এখন কী পদক্ষেপ নেয়, জনতা সেদিকেই তাকিয়ে আছে। চিকিৎসকের ছদ্মবেশে থাকা কোনো কসাই যেন পার পেয়ে না যায়।