প্রতারণার আড়ালে দেশবিরোধী তৎপরতার অভিযোগ, পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার
অনুসন্ধানী প্রতিবেদক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী উপজেলা ভোলাহাটে ইয়াকুব আলী (২৯) নামের এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ অভিযোগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। কখনো পুলিশ, কখনো র্যাব, আবার কখনো বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ‘সোর্স’ পরিচয়ে এলাকায় দাপিয়ে বেড়ানো এই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মাঝে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের দাবি, ইয়াকুব শুধু একজন সাধারণ প্রতারক নয়; বরং প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে সীমান্ত এলাকায় সন্দেহজনক তৎপরতা চালিয়ে আসছে। এমনকি তার বিরুদ্ধে ভিনদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচারের অভিযোগও উঠেছে, যা বর্তমানে তদন্তাধীন।
ভুয়া পরিচয়ে চাঁদাবাজি
অনুসন্ধানে জানা যায়, চামুসা গ্রামের বাসিন্দা মোজাম্মেল হক টুনুর ছেলে ইয়াকুব আলীর শিক্ষাগত যোগ্যতা মাত্র তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। তবে বিভিন্ন ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে নিজেকে সাংবাদিক ও সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য দাবি করে সে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করত। প্রশাসনের ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
মামলার পাহাড়, তবুও বেপরোয়া
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ইয়াকুব আলীর বিরুদ্ধে ভোলাহাট থানাসহ বিভিন্ন থানায় চাঁদাবাজি, মাদক, হুমকি ও মারামারিসহ অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। ২০২২ সালে গ্রেফতার হয়ে জামিনে বেরিয়ে এসে সে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি চরধরমপুর গ্রামে ভুয়া পরিচয়ে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে স্থানীয়দের হাতে আটক হয়ে গণধোলাইয়ের ঘটনাও ঘটে।
মিথ্যা মামলা ও অপপ্রচার
গণধোলাইয়ের পর ইয়াকুব নিজেকে রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার দাবি করে ভোলাহাট থানায় একটি মামলা দায়ের করে। তবে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে, ঘটনাটি রাজনৈতিক নয়; বরং ভুয়া গোয়েন্দা পরিচয়ে চাঁদাবাজির কারণেই সে জনরোষের শিকার হয়। পরে নিজের মামলায় অগ্রগতি না হওয়ায় ইয়াকুব ভোলাহাট থানার ওসি ও পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে জড়ায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিকাশে ‘ডোনেশন’ ও অসাধু চক্র
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, ইয়াকুবের বিকাশ নম্বরে নিয়মিত ‘ডোনেশন’ বা অর্থ লেনদেন হতো, যা তথ্য আদান-প্রদানের আড়ালে একটি অসাধু চক্রের অস্তিত্বের ইঙ্গিত দেয়। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছে।
সাংবাদিক পরিচয়ে প্রতারণা
নিজেকে প্রভাবশালী সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ইয়াকুব দেশ ও বিদেশে অবস্থানরত মানুষের সঙ্গেও প্রতারণা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিদেশে লোক পাঠানো ও প্রশাসনিক তদবিরের নামে বহু মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ভুক্তভোগীদের মুখে মুখে।
প্রশাসনের বক্তব্য
ভোলাহাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জানান, ইয়াকুব একজন তালিকাভুক্ত অপরাধী। তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারও জানান, ইয়াকুবের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে এবং প্রমাণ সাপেক্ষে যে কোনো সময় তাকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে।
এলাকাবাসীর দাবি
এলাকাবাসীর একটাই দাবি—দেশের সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের জানমালের সুরক্ষার স্বার্থে ইয়াকুব আলীর বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। সচেতন মহলের মতে, প্রশাসনের নাম ব্যবহার করে অপরাধ চালালে মানুষের আস্থা নষ্ট হয়; তাই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই পারে এমন অপরাধ দমন করতে।