ডেসটিনি কেলেঙ্কারির কেন্দ্রবিন্দুতে প্রশান্ত ভূষণ ও আশরাফুল আমিন: ৪৩.৫ লাখ বিনিয়োগকারীর টাকার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের চিত্র উন্মোচিত
বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ ডেস্ক | জনতার কণ্ঠস্বর | ৩১ জুলাই ২০২৫
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও বিভাজিত আর্থিক কেলেঙ্কারির একটি—ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেড। প্রায় এক যুগের বেশি সময় ধরে স্থবির এই কোম্পানির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকলেও এর ৪৩.৫ লাখ সাধারণ বিনিয়োগকারীর অর্থ আটকে আছে এখনো। এই প্রেক্ষাপটে ডেসটিনির মূল নেতৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু কর্মকর্তা ও আইনজীবীর বিরুদ্ধে উঠেছে ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের অভিযোগ—যা শুধু এই কোম্পানির সম্পদ বিক্রি ও লুটপাটেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদের উপর আঘাত, বিচার প্রক্রিয়ার ধ্বংস, এবং গণমানুষের ভাগ্য নিয়ে নিষ্ঠুর ছিনিমিনি খেলার স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।
প্রশান্ত ভূষণ বারুয়া: ‘আইনজীবী’র মুখোশের আড়ালে সিন্ডিকেটের মূল মাস্টারমাইন্ড?
ডেসটিনি ২০০০-এর মামলা প্রক্রিয়ায় একসময় দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনজীবী ছিলেন প্রশান্ত ভূষণ বারুয়া। কিন্তু তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, তিনি কেবল মামলার তদারকি করেই থেমে থাকেননি; বরং ডেসটিনির মালিকানার স্বত্ব এবং জমি-বাড়ির দখল প্রক্রিয়ার পেছনে থেকেছেন সক্রিয় কুশীলব হিসেবে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, তিনি জামিনে মুক্ত হওয়ার পর একাংশ কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশে ডেসটিনির হাজার হাজার বিঘা জমি, শতাধিক ফ্ল্যাট এবং অফিস ভাড়া দিয়ে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
এমনকি একাধিক বিনিয়োগকারী অভিযোগ করেছেন, প্রশান্ত ভূষণ নিজেই এখন ডেসটিনি কর্পোরেট অফিস পরিচালনা করছেন, অথচ কোম্পানির মূল পরিচালকরা জামিনে মুক্ত না হওয়ায় তাদের মতামত বা অনুমোদন ছাড়াই তার এই স্বঘোষিত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নিয়েই উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
আশরাফুল আমিন: একদা কর্মচারী, আজ কর্পোরেট ছদ্মমালিক?
ডেসটিনির সাবেক মধ্যম সারির কর্মকর্তা আশরাফুল আমিন এখন নিজেকে কোম্পানির ‘পরিচালক’ হিসেবে পরিচয় দেন। অথচ তার কোনো নিয়োগপত্র, বোর্ড মিটিংয়ে উপস্থিতি কিংবা কোম্পানি অ্যাক্ট অনুসারে বৈধতা খুঁজে পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আশরাফুল আমিন মূলত প্রশান্ত ভূষণের ছত্রছায়ায় কাজ করছেন এবং ডেসটিনির অবকাঠামো, ভাড়া প্রাপ্ত আয়, রিয়েল এস্টেট ও অন্যান্য সম্পদের বিপুল অংশ নিয়ন্ত্রণ করছেন অবৈধভাবে।
৪৩.৫ লাখ সাধারণ বিনিয়োগকারী এখন কোথায়?
ডেসটিনির বড় শক্তি ছিল এর জনগণনির্ভর বিনিয়োগ কাঠামো। গ্রামের স্কুল শিক্ষক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা পর্যন্ত তাদের কষ্টার্জিত টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন এই কোম্পানিতে। আজ তারা নিঃস্ব, অথচ কোম্পানির তহবিল থেকে কোটি কোটি টাকা অজ্ঞাত উৎসে গায়েব হয়ে গেছে।
এক বিনিয়োগকারী বলেন:
> “আমরা আজো ডেসটিনির অফিস গেটে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, কিন্তু সেই অফিস আজ প্রশান্ত আর আশরাফুলদের দখলে। কোর্টের আদেশ আছে কোম্পানির সম্পদ বিক্রি না করার, তবুও ভাড়া খাওয়ানো হচ্ছে, টাকা উঠানো হচ্ছে, অথচ আমাদের ১ টাকাও ফেরত আসছে না।”
উচ্চ আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে সম্পত্তি বাণিজ্য
২০১৬ সালের হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, ডেসটিনির সম্পদ বিক্রি বা হস্তান্তর করা যাবে না। সেই নির্দেশনার আলোকে দুদক মামলাও পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, ‘পরিচালনা বোর্ড’ না থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন সম্পদ এখনো অবৈধভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, এবং সেটি আদালতের চোখে ধুলো দিয়ে।
অভিযোগ উঠেছে, এই সিন্ডিকেট জালভোটের মতো নকল বোর্ড রেজুলিউশন বানিয়ে বিভিন্ন সম্পত্তি ‘ভাড়া’ দেখাচ্ছে, যার কোনো বৈধ কাগজপত্র আদালতে দাখিল হয়নি। অথচ এই ভাড়াবাবদ কোটি কোটি টাকা কার পকেটে যাচ্ছে, তার কোনো সরকারি রেকর্ড নেই।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন: বিনিয়োগকারীদের জোরালো দাবি
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন দুর্নীতি দমন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠনের অঙ্গীকার নিয়েছে, তখন ডেসটিনির মতো বৃহৎ আর্থিক কেলেঙ্কারিকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। তদন্ত, সম্পদ পুনরুদ্ধার, প্রকৃত পরিচালকদের দিয়ে কোম্পানির স্বচ্ছ পুনর্গঠন, এবং জনগণের বিনিয়োগ ফেরত দেওয়ার জন্য নিরপেক্ষ ট্রাস্টি বোর্ড গঠন এখন সময়ের দাবি।
একজন প্রাক্তন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন:
> “যে কোম্পানির সম্পদ আজও বাজারমূল্যে হাজার হাজার কোটি টাকা, সেখানে রাষ্ট্র যদি চায় তবে প্রতিটি বিনিয়োগকারীকে তার মূলধন ফেরত দেওয়া সম্ভব—শুধু চাই নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং এই দখলদার চক্রের নির্মূল।”
উপসংহার
ডেসটিনির ভবিষ্যৎ শুধু একটি কোম্পানির নয়, এটি ৪৩.৫ লাখ পরিবারের ভবিষ্যৎ। প্রশান্ত ভূষণ বারুয়া ও আশরাফুল আমিনের মতো চক্রান্তকারীদের হাত থেকে যদি কোম্পানির সম্পদ রক্ষা না করা যায়, তাহলে এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জনগণবিরোধী ধোঁকাবাজির বৈধায়ন। এখন সময়, রাষ্ট্র এগিয়ে আসুক—আদালতের নির্দেশনার বাস্তবায়ন এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষায় যেন আর বিলম্ব না ঘটে।