গোদাগাড়ীতে চার ভাইয়ের অপরাধ সাম্রাজ্য ও ভেঙে পড়া সামাজিক শান্তি
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মাদারপুর ও ডিমভাঙ্গা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এক বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। অবাধ মাদক ব্যবসা, অবৈধ অস্ত্র পাচার এবং নিরীহ মানুষের ওপর নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে একটি সংঘবদ্ধ চক্র স্থানীয় শান্তি ও আইনশৃঙ্খলা চরমভাবে বিঘ্নিত করছে। সম্প্রতি মাদকের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং এক ভুক্তভোগী তরুণীর অনশনের সূত্র ধরে এই চার ভাইয়ের অন্ধকার জগতের ভয়ংকর রূপ উন্মোচিত হয়েছে।

মাদকের ভয়াল থাবা ও প্রাণনাশের হুমকি
স্থানীয় জননিরাপত্তা ও যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে মাদারপুর ডিমভাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা মোঃ জামাল উদ্দীন (৪৬) গোদাগাড়ী থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন (জিডি নং- ১১৮৭, ট্র্যাকিং নং- WQUY SC)।
অভিযুক্ত: জিডিতে ১ নম্বর বিবাদী মোঃ মাসুদ রানা (৩৭) এবং ২ নম্বর বিবাদী মোঃ মনিরুল ইসলাম (৪৩)-সহ তাদের সহযোগীদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অপরাধ: এলাকায় ইয়াবা, গাঁজা ও ফেনসিডিলসহ ভয়ংকর সব মাদক সরবরাহ।
হুমকি: গত ১০ মে বিকেলে প্রতিবাদকারীদের প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়, যা স্থানীয় শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গের একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত।
বিয়ের দাবিতে তরুণীর অনশন ও চরম অমানবিকতা
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ডিমভাঙ্গাস্থ অভিযুক্তদের আরেক ভাই সোহেল রানার (৩২) বাড়িতে পলি (২৮) নামের এক তরুণী বিয়ের দাবিতে অনশন শুরু করেন।
ভুক্তভোগী তরুণীর অভিযোগ, তাকে বিয়ের প্রলোভন ও মাদকের ভয় দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি অন্তঃসত্ত্বা। সমাজে ন্যায়বিচার ও শান্তিরক্ষার স্বার্থে দ্রুত সমাধান না হলে তিনি নিজ শরীরে আগুন জ্বালিয়ে আত্মহত্যার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল হোতা: চার ভাইয়ের আমলনামা
সীমান্ত পেরিয়ে নদীপথে অবৈধ অস্ত্র ও হেরোইন পাচার করে এই পরিবারটি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছে। অনুসন্ধানে এই চার ভাইয়ের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত বিভিন্ন কঠোর আইনে দায়ের করা একাধিক চাঞ্চল্যকর মামলার তথ্য পাওয়া গেছে:
মোঃ মনিরুল ইসলাম (৪৮): ৪ কেজি হেরোইন উদ্ধার, মারামারি, বিস্ফোরক আইন এবং রাষ্ট্রের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অভিযোগে একাধিক রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।
মোঃ মেহেদী হাসান (৪৪): ২০১২ সাল থেকে মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত। সম্প্রতি বিস্ফোরক ও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় সে পলাতক রয়েছে।
মোঃ আব্দুর রহিম টিসু (৩৮): ২০২৪ সালে ৪ কেজি ৩০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত। তার বিরুদ্ধে বোয়ালিয়া ও গোদাগাড়ী থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা রয়েছে।
মোঃ সোহেল রানা (৩৮): একাধিক বিশেষ ক্ষমতা ও বিস্ফোরক মামলার পাশাপাশি ভুক্তভোগী তরুণীর দায়ের করা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় ধর্ষণ ও গর্ভপাত মামলার প্রধান অভিযুক্ত।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ ও জনমনে প্রত্যাশা
এলাকায় শান্তি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গোদাগাড়ী থানা পুলিশ ইতোমধ্যে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নির্দেশে এএসআই মোঃ মজনু মিয়া জিডির প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছেন। অন্যদিকে, ভুক্তভোগী তরুণীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং দণ্ডবিধির (Penal Code) সংশ্লিষ্ট ধারায় নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে। আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, সমাজের শান্তি, শৃঙ্খলা এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে এই সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের মূল উৎপাটন করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
প্রতিবেদনে:
মোঃ রবিউল ইসলাম মিনাল
রাজশাহী গোদাগাড়ী প্রতিনিধি