মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি :
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে নদী ও পরিবেশের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে এমন অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করেছে উপজেলা প্রশাসন। অভিযানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম ধ্বংস করা হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তোলিত বালু জব্দ এবং বালুবোঝাই একটি ট্রাক আটক করেছে প্রশাসন।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) মিরসরাই উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের অলিনগর মোল্লারঘাট ও চৌধুরীঘাট এলাকায় এ যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযানে নেতৃত্ব দেন মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার এবং উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তানভীরুল কাদের। অভিযানে জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ ও বারইয়ারহাট ফায়ার সার্ভিস সহযোগিতা করে।
২০ হাজার ফুট পাইপ ও ১০ শ্যালো মেশিন ধ্বংস
অভিযানকালে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত প্রায় ২০ হাজার ফুট পাইপ এবং ১০টি শ্যালো মেশিন বিনষ্ট করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে মজুত ও উত্তোলন করা বালু জব্দ করা হয়।
অভিযান চলাকালে বালু পরিবহনে ব্যবহৃত একটি বালুবোঝাই ট্রাকও জব্দ করা হয়েছে।
প্রশাসনের এ অভিযানে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের ব্যবহৃত সরঞ্জাম ধ্বংস করায় স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নদী ও নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন স্থান থেকে অনুমোদন ছাড়া বালু উত্তোলনের কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নদীর গতিপথ, তীর ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
অবৈধ বালু উত্তোলনে পরিবেশের ভয়াবহ ক্ষতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশের স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তিত হতে পারে। এতে নদীভাঙন, তীরবর্তী বসতি ও কৃষিজমির ক্ষতি এবং পানি প্রবাহের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শুধু পরিবেশ নয়, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে সরকারি সম্পদের ক্ষতিও জড়িত। কোনো ব্যক্তি বা চক্র অনুমোদন ছাড়া সরকারি নদী বা খাস জমি থেকে বালু উত্তোলন করে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করলে তা প্রশাসনিক ও আইনগতভাবে গুরুতর বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ইউএনওর কঠোর বার্তা
মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার সোমাইয়া আক্তার বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদী ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জনসাধারণের সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কোনোভাবেই বালু উত্তোলন করতে দেওয়া হবে না। অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, সরকারি সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হবে।
জড়িতদের কী ধরনের শাস্তি হতে পারে?
অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনায় শুধু সরঞ্জাম ধ্বংস বা বালু জব্দ করাই শেষ ব্যবস্থা নয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, বালু উত্তোলনকারী, পরিবহনকারী এবং অবৈধ কার্যক্রমে সহযোগিতাকারীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত আইনের আওতায় অনুমোদন ছাড়া বা আইনবহির্ভূতভাবে বালু বা মাটি উত্তোলন করলে জরিমানা, কারাদণ্ড এবং ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি/যানবাহন জব্দের মতো আইনগত ব্যবস্থা হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট ঘটনায় কোন ধারা প্রয়োগ হবে এবং কী শাস্তি হবে, তা নির্ভর করবে তদন্তে প্রমাণিত অভিযোগ, উত্তোলনের স্থান, অনুমোদনের অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অপরাধের ওপর।
অতএব, অভিযানে জব্দ করা ট্রাক, পাইপ, শ্যালো মেশিনসহ অন্যান্য সরঞ্জামের মালিকানা এবং সেগুলো অবৈধ উত্তোলনে ব্যবহারের বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু শ্রমিক নয়, মূল হোতাদেরও শনাক্ত করার দাবি
স্থানীয়দের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনায় শুধু নদীর পাড়ে থাকা শ্রমিক বা মেশিন পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে মূল চক্র ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যেতে পারে।
তাই প্রশাসনের তদন্তে—
– কারা বালু উত্তোলনের নির্দেশ দিয়েছে;
– কারা অর্থায়ন করেছে;
– কারা পাইপ ও শ্যালো মেশিন সরবরাহ করেছে;
– উত্তোলিত বালু কার কাছে বিক্রি করা হয়েছে;
– কোন কোন ট্রাকে বালু পরিবহন করা হয়েছে;
– বালু বিক্রির অর্থনৈতিক লেনদেনের সঙ্গে কারা জড়িত;
– সংশ্লিষ্টদের কোনো বৈধ ইজারা বা অনুমোদন ছিল কি না;
– এবং কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তি অবৈধ কার্যক্রমে সহযোগিতা করেছে কি না—
এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
তবে তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্তের আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে অভিহিত করা আইনসঙ্গত নয়।
প্রশাসনের অভিযানকে স্বাগত স্থানীয়দের
মিরসরাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, একদিনের অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অবৈধ উত্তোলন বন্ধ করতে নিয়মিত নজরদারি, নদী ও বালুমহাল এলাকায় অভিযান এবং জব্দ করা সরঞ্জাম পুনরায় ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের আরও দাবি, রাতের আঁধারে যাতে আবার বালু উত্তোলন শুরু না হয়, সে জন্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত টহল ও নজরদারি বাড়াতে হবে।
কঠোর নজরদারি প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি—নিয়মিত অভিযান, মূল অর্থদাতা ও নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করা এবং আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে। এখন জব্দ করা বালু, ট্রাক ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকেই নজর স্থানীয়দের।
প্রতিবেদনের শেষ কথা
মিরসরাইয়ের নদী, পরিবেশ ও সরকারি সম্পদ রক্ষায় অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের এ অভিযান গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। তবে অভিযানকে কার্যকর ও স্থায়ী করতে হলে শুধু পাইপ ও শ্যালো মেশিন ধ্বংস করাই যথেষ্ট নয়—অবৈধ বালু উত্তোলনের পেছনে থাকা মূল চক্র, অর্থের উৎস ও বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যদি প্রকৃত জড়িতদের আইনের আওতায় আনা যায়, তাহলে মিরসরাইয়ের নদী ও পরিবেশ রক্ষায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।