গলায় ছুরি ধরে হত্যার হুমকি, আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন ও স্বর্ণালংকার-নগদ টাকা লুটের দাবি; বিচার চাইতে গিয়ে থানায় হয়রানির অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারের
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান এলাকায় একটি বাসায় সাবলেট ভাড়া থাকাকে কেন্দ্র করে এক নারী ও তাঁর মাত্র এক বছর বয়সী শিশুসন্তানের ওপর সংঘবদ্ধ হামলার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় রকি, তাঁর স্ত্রী নীরা, রকির দুই বন্ধু এবং নীরার এক বান্ধবীসহ মোট পাঁচজনের বিরুদ্ধে হামলা, মারধর, অস্ত্রের ভয় দেখানো এবং বাসা থেকে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
এ ঘটনায় আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মোহাম্মদপুর থানার পুলিশের কয়েকজন সদস্যের ভূমিকা নিয়ে। পরিবারের দাবি, হামলার শিকার নারী ও শিশুকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া, চিকিৎসা গ্রহণ এবং পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানোর পরও তাঁরা প্রত্যাশিত আইনি সহায়তা পাননি। অভিযোগের খসড়া তৈরি ও স্বাক্ষর নেওয়ার পরও মামলার নম্বর এবং এজাহারের কপি দেওয়া হয়নি বলে দাবি পরিবারের।
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বিবৃতিতে ভুক্তভোগী নারীর স্বজন এসব অভিযোগ তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, পুলিশ সদর দপ্তর, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং মানবাধিকারকর্মীদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সাবলেট ভাড়া থেকে বিরোধের সূত্রপাত
ভুক্তভোগী পরিবারের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান এলাকায় ওই নারী তাঁর বাসার একটি কক্ষ রকি ও তাঁর স্ত্রী নীরাকে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে সাবলেট ভাড়া দিয়েছিলেন।
পরিবারের অভিযোগ, বাসায় বসবাসের একপর্যায়ে রকি ওই নারীকে অনৈতিক প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে রকিকে বাসা ছেড়ে চলে যেতে বলেন। তবে রকি বাসা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান।
পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে ভুক্তভোগী নারী বিষয়টি রকির স্ত্রী নীরাকে জানান এবং তাঁর স্বামীকে বাসা থেকে সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেন।
পরিবারের দাবি, এ ঘটনার পর থেকেই তাঁদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে ওই বাসায় হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পাঁচজন মিলে বাসায় হামলার অভিযোগ
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৫ নভেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান এলাকার ওই বাসাকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনা ঘটে।
বিবরণে বলা হয়েছে, রকির স্ত্রী নীরা, রকি, রকির দুই বন্ধু এবং নীরার এক বান্ধবীসহ মোট পাঁচজন ওই বাসায় গিয়ে হামলা চালান বলে অভিযোগ উঠেছে।
সে সময় বাসায় ছিলেন মাত্র তিনজন। তাঁরা হলেন—ভুক্তভোগী নারী, তাঁর মাত্র এক বছর বয়সী শিশুসন্তান এবং শিশুটির দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা একজন তরুণী।
ভুক্তভোগী নারীর স্বামী তখন বাসায় ছিলেন না। পরিবারের দাবি, স্বামীর অনুপস্থিতির সুযোগে অভিযুক্তরা বাসায় প্রবেশ করে তাঁদের ওপর হামলা চালান।
অভিযোগে বলা হয়েছে, রকি ও তাঁর স্ত্রী নীরা ওই নারীকে মারধর করেন। তাঁর চুল ধরে টানাহেঁচড়া করা হয় এবং মাথা ও ঘাড়ে আঘাত করা হয়। একপর্যায়ে তাঁর গলায় ছুরি ধরে ভয়ভীতি দেখানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ সময় হামলায় অংশ নেওয়া দুই পুরুষের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রসদৃশ বস্তু দেখা গেছে বলে পরিবারের দাবি। তবে অস্ত্রগুলো প্রকৃত আগ্নেয়াস্ত্র ছিল কি না, তা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছে পরিবার।
হামলা থেকে রেহাই পায়নি এক বছরের শিশুও
ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশ হলো, হামলার সময় মাত্র এক বছর বয়সী শিশুটিও আঘাতের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার সময় শিশুটিকে মারধর করা হয়। এতে শিশুটির কপাল ফুলে লাল হয়ে যায়।
একটি ছোট শিশুর ওপর এমন হামলার অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একই বাসায় থাকা শিশুটির দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা তরুণীও হামলার শিকার হয়েছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
পরিবারের প্রশ্ন, ব্যক্তিগত বিরোধ থাকলেও তার দায় কেন একজন নারী ও নিষ্পাপ শিশুকে বহন করতে হবে?
স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ
শুধু শারীরিক হামলা বা ভয়ভীতি প্রদর্শন নয়, ওই বাসায় থাকা স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকাপয়সাও অভিযুক্তরা নিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগী পরিবার।
পরিবারের দাবি, হামলার পর অভিযুক্তরা বাসা থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
কত পরিমাণ স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা খোয়া গেছে, সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা এবং মালিকানার প্রমাণ তদন্তের স্বার্থে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ঘটনায় বাসার সিসিটিভি ফুটেজ, আশপাশের ভবনের ক্যামেরা, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অভিযুক্তদের ঘটনাস্থলে যাতায়াতের তথ্য সংগ্রহের দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।
৯৯৯-এ ফোন করেও তাৎক্ষণিক সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ
পরিবারের বিবরণ অনুযায়ী, হামলার পর আতঙ্কিত অবস্থায় ভুক্তভোগী নারী জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করেন। তবে তাঁর অভিযোগ, ফোন করার পরও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাননি।
পরে তিনি তাঁর স্বামীকে ফোন করে ঘটনাটি জানান। খবর পেয়ে তাঁর স্বামী মোহাম্মদপুর থানা থেকে পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই অভিযুক্তরা সেখান থেকে পালিয়ে যান বলে পরিবারের দাবি।
পরবর্তী সময়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পরিদর্শন করে।
তবে ৯৯৯-এ ফোন করার সময়, কল গ্রহণের তথ্য, সংশ্লিষ্ট থানা বা ইউনিটে বার্তা পাঠানোর সময় এবং পুলিশের ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সময় সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া গেলে জরুরি সেবার ভূমিকা আরও স্পষ্ট হবে।
ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা, নথিতে ‘Physical Assault’ ও ‘Police Case’
হামলার পর ওই রাতেই ভুক্তভোগী নারী ও তাঁর শিশুসন্তানকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পরিবারের দাবি, হাসপাতালের চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিতে ‘Physical Assault’ এবং ‘Police Case’ উল্লেখ করা হয়েছে।
চিকিৎসাসংক্রান্ত এসব নথি ঘটনার পর চিকিৎসা গ্রহণের বিষয়টি যাচাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে আঘাতের প্রকৃতি, মাত্রা ও কারণ সম্পর্কে চিকিৎসকের লিখিত প্রতিবেদন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং অন্যান্য মেডিকেল রেকর্ড পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে শিশুটির শারীরিক অবস্থা এবং মাথা ও ঘাড়ে আঘাত পাওয়ার অভিযোগ যথাযথ চিকিৎসা ও মেডিকেল পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা জরুরি।
মামলা করতে গিয়ে থানায় বারবার ঘোরার অভিযোগ
ঘটনার পর আইনি প্রতিকার চাইতে গিয়ে নতুন করে ভোগান্তির মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী নারী।
পরিবারের বিবরণ অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর থানার একজন উপপরিদর্শক (এসআই) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে অভিযোগ গ্রহণ ও মামলা করার প্রক্রিয়ার কথা বলে ভুক্তভোগী নারীকে সঙ্গে করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
পরিবারের দাবি, ওই নারী সেদিন রাতেই থানায় গিয়ে অভিযোগ জানাতে চাইলে তাঁকে সকালে আসতে বলা হয়।
পরদিন সকালে থানায় গেলে তাঁকে জানানো হয়, ডিআইজি নেই; সন্ধ্যায় আসতে হবে। এভাবে বিভিন্ন সময়ে তাঁকে অপেক্ষা করতে বলা হয় বলে পরিবারের অভিযোগ।
পরিবারের ভাষ্য, একজন নারী ও শিশুর ওপর হামলার অভিযোগের পর দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছিল বলে তাঁদের মনে হয়েছে।
প্রভাব খাটানো কিংবা অর্থ লেনদেনের আশঙ্কা পরিবারের
ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, অভিযুক্ত রকি কোনোভাবে অর্থের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রভাবিত করেছেন কি না, তা নিয়ে তাঁদের সন্দেহ রয়েছে।
তবে এ ধরনের কোনো অর্থ লেনদেন, ঘুষ গ্রহণ কিংবা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে অভিযুক্তদের যোগসাজশের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ সামনে আসেনি।
পরিবারের দাবি, মামলার অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে কি না এবং অভিযুক্তদের সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে কি না, তা ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক।
অভিযোগের খসড়া তৈরি, স্বাক্ষর নেওয়ার পরও মামলা নম্বর না পাওয়ার দাবি
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে তাঁদের এক চাচাতো ভাই, যিনি বিশেষায়িত বাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলে পরিবার জানিয়েছে, মোহাম্মদপুর থানার ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
এরপর অভিযোগপত্র তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়। অভিযোগের খসড়া প্রস্তুত করে ভুক্তভোগী নারীর স্বাক্ষরও নেওয়া হয় বলে পরিবারের দাবি।
কিন্তু অভিযোগের খসড়ায় স্বাক্ষর নেওয়ার পরও তাঁকে মামলার নম্বর দেওয়া হয়নি এবং এজাহারের কোনো কপিও সরবরাহ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরিবারের দাবি, পরবর্তী সময়ে আবার থানায় আসতে বলা হয়।
৭ নভেম্বর থানায় গিয়ে ওসিকে না পাওয়ার অভিযোগ
পরিবারের বিবরণ অনুযায়ী, ৭ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে ভুক্তভোগী নারী আবার মোহাম্মদপুর থানায় যান।
তাঁদের অভিযোগ, ওই সময় ওসির কক্ষ বন্ধ করে তিনি থানা থেকে বের হয়ে যান। ফলে ভুক্তভোগী নারী তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারেননি।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট এসআইয়ের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি ওসির এখতিয়ারাধীন বলে জানান বলে পরিবারের দাবি।
পরিবারের আরও অভিযোগ, মামলা চূড়ান্ত করার পরিবর্তে তাঁদের বারবার মীমাংসার বিষয়ে কথা বলা হচ্ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে একজন অভিযোগকারী নারী কীভাবে আইনগত প্রতিকার পাবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর স্বজনরা।
আইনগত বিষয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, থানায় তাঁদের এমন কিছু কথা বলা হয়েছে, যা নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগী নারীর গলায় ছুরির দাগ না থাকলে ‘অ্যাটেম্পট টু মার্ডার’ মামলা হবে না এবং স্বামী ছাড়া নারী নির্যাতনের মামলা হয় না—এমন বক্তব্য দেওয়া হয়েছে বলে ওই নারী জানিয়েছেন।
এমনকি অভিযোগ দায়ের করে তা প্রমাণ করতে না পারলে উল্টো তাঁকেই কারাগারে যেতে হতে পারে—এমন কথাও বলা হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ।
আইনগতভাবে এসব বক্তব্যের যথার্থতা যাচাই করা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, কোনো অপরাধের অভিযোগে মামলা বা অভিযোগ গ্রহণের বিষয়টি নির্দিষ্ট কোনো দৃশ্যমান আঘাতের দাগের ওপর এককভাবে নির্ভর করে না। একইভাবে নারী নির্যাতনের প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক থাকা বাধ্যতামূলক নয়। ঘটনার প্রকৃতি, প্রযোজ্য আইন, প্রমাণ ও অভিযোগের উপাদান অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নির্ধারিত হয়।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থার। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া এবং জেনেশুনে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা এক বিষয় নয়। এ দুটিকে এক করে ভুক্তভোগীকে ভয় দেখানো হলে তা অবশ্যই তদন্তের দাবি রাখে।
অভিযুক্তদের পরিচয় শনাক্ত ও বক্তব্য নেওয়ার দাবি
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রকি ও তাঁর স্ত্রী নীরার নাম-পরিচয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইলসংক্রান্ত তথ্য তাঁদের কাছে রয়েছে।
রকি আগে মিরপুরের আলোক হাসপাতালে আইসিইউ বিভাগে কর্মরত ছিলেন বলে পরিবার জানিয়েছে। তাঁর স্ত্রী পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালে নার্সিং বিষয়ে ইন্টার্নশিপ করছেন বলেও পরিবারের দাবি।
তবে এসব পেশাগত পরিচয় ও কর্মস্থলের তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা নির্ভরযোগ্য নথির মাধ্যমে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত অন্য তিনজনের পরিচয়ও তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করা প্রয়োজন।
পরিবারের দেওয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইলগুলো তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের কাছে যাচাইয়ের জন্য জমা দেওয়া যেতে পারে। পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইলের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।
অভিযুক্ত রকি, নীরা এবং অন্যদের বক্তব্যও এ প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর চায় ভুক্তভোগী পরিবার
ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে পরিবার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর ও প্রতিকার চেয়েছে—
১. একজন নারী ও মাত্র এক বছর বয়সী শিশুর ওপর হামলার অভিযোগ পাওয়ার পরও কেন তাঁদের বারবার থানায় যেতে হচ্ছে?
২. গলায় ছুরি ধরে ভয় দেখানো, শারীরিক হামলা এবং স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হচ্ছে কি না?
৩. অভিযোগের খসড়ায় স্বাক্ষর নেওয়ার পরও মামলার নম্বর ও এজাহারের কপি দেওয়া হয়নি কেন?
৪. সংশ্লিষ্ট এসআই ও ওসির বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, সময়ক্ষেপণ কিংবা অভিযোগকারীকে নিরুৎসাহিত করার অভিযোগের সত্যতা কী?
৫. অভিযুক্তদের সঙ্গে কোনো পুলিশ সদস্যের অবৈধ অর্থ লেনদেন বা যোগাযোগ হয়েছে কি না, তা কি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হবে?
৬. জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করার পর কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং সহায়তা পৌঁছাতে বিলম্ব হয়ে থাকলে তার কারণ কী?
৭. ভুক্তভোগী নারী ও তাঁর শিশুসন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
পরিবারের ছয় দফা দাবি
ভুক্তভোগী পরিবার সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে ছয়টি দাবি জানিয়েছে—
প্রথমত: রকি, তাঁর স্ত্রী নীরা এবং হামলায় অংশ নেওয়া অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করে অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত: হামলা, অস্ত্র প্রদর্শন, ভয়ভীতি এবং স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।
তৃতীয়ত: সংশ্লিষ্ট এসআই ও থানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করতে হবে।
চতুর্থত: আইন অনুযায়ী অভিযোগ ও মামলার বর্তমান অবস্থা জানাতে হবে এবং মামলা রুজু হয়ে থাকলে এজাহারের কপি সরবরাহ করতে হবে।
পঞ্চমত: ভুক্তভোগী নারী ও তাঁর এক বছর বয়সী শিশুসন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
ষষ্ঠত: অভিযুক্তদের প্রভাব বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা যা-ই থাকুক, তদন্ত যেন নিরপেক্ষ ও আইনানুগভাবে পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা
ভুক্তভোগী পরিবারের বক্তব্য, তাঁরা কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নিতে চান না; তাঁরা শুধু আইনের আশ্রয় এবং ন্যায়বিচার চান।
একজন নারী ও তাঁর শিশুসন্তানের ওপর হামলার অভিযোগ যেমন গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন, তেমনি পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।
এ ঘটনায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট জোনের উপকমিশনার (ডিসি), মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে ভুক্তভোগী পরিবার।
পরিবারের প্রত্যাশা, অভিযুক্তদের পরিচয়, ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ, চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি, ৯৯৯-এর কল রেকর্ড, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং থানায় অভিযোগ গ্রহণের নথি পর্যালোচনা করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা হবে।
একই সঙ্গে থানায় অভিযোগ গ্রহণ ও মামলা রুজু না হওয়ার অভিযোগেরও ব্যাখ্যা দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—একজন নারী ও মাত্র এক বছর বয়সী শিশুর ওপর হামলার অভিযোগের পরও যদি একজন ভুক্তভোগীকে ন্যায়বিচারের জন্য দিনের পর দিন থানার দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ আইনগত সহায়তা পাবে কোথায়?
আমরা চাই, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। কেউ অপরাধী হলে আইন অনুযায়ী তাঁর বিচার হোক, আর পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটিও তদন্তের আওতায় আসুক। কোনো পক্ষ যেন প্রভাব, অর্থ কিংবা ক্ষমতা ব্যবহার করে আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে।
জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বক্তব্য ও তদন্তের অগ্রগতি জানার অপেক্ষায়।
—
প্রতিবেদনের তথ্যসূত্র: ভুক্তভোগী পরিবারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত লিখিত অভিযোগ ও সরবরাহ করা বিবরণ।
সম্পাদনা ও প্রকাশনা: বাংলাদেশ পোস্ট ২৪ | Bangladesh Post 24
সম্পাদকীয় নোট: এ প্রতিবেদনে উল্লিখিত হামলা, লুটপাট, অস্ত্র প্রদর্শন এবং পুলিশের বিরুদ্ধে ঘুষ ও যোগসাজশের বিষয়গুলো ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে উপস্থাপিত। এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও আনুষ্ঠানিক সত্যতা নিশ্চিত হওয়া বাকি। অভিযুক্তদের বক্তব্য এবং মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। কাউকে তদন্ত বা আদালতের সিদ্ধান্তের আগে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করা হচ্ছে না।