রাজশাহী ব্যুরো চিফ | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
রাজশাহী মহানগরীর মতিহার থানা এলাকার বাসিন্দা মাসুদ রানা রাব্বানীকে ঘিরে পুলিশের অপরাধ-তথ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম—সিডিএমএসে সংরক্ষিত পুরোনো মামলার তথ্য নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাব্বানীর বিরুদ্ধে অতীতে দায়ের হওয়া একাধিক মামলা ও সাধারণ ডায়েরির তথ্য পুলিশের অপরাধ-তথ্য ব্যবস্থায় সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ওই তথ্যের একটি অংশ সিডিএমএসে আর দৃশ্যমান পাওয়া যাচ্ছে না।
বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত কারণ উদঘাটনের দাবিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক—আইজিপি বরাবর লিখিত আবেদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগে প্রশ্ন তোলা হয়েছে—তথ্যগুলো কোনো কারিগরি ত্রুটি, সার্ভার বা ডাটা মাইগ্রেশনজনিত সমস্যা, তথ্য সংরক্ষণে প্রশাসনিক ত্রুটি, নাকি অননুমোদিত কোনো পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে না।
রাজশাহী মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্তাধীন। স্থানীয় পর্যায়ে সিডিএমএসে তথ্য সংযোজনের সুযোগ থাকলেও তথ্য মুছে ফেলা বা রিমুভ করার সুযোগ নেই ব লে জানিয়েছেন আরএমপি কমিশনার (ডিআইজি) মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
তবে এখন পর্যন্ত তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে মুছে ফেলা হয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত বা তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে পুরো বিষয়টি বর্তমানে অভিযোগ, নথি এবং চলমান তদন্তের পর্যায়েই রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া লিখিত আবেদনে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, মাসুদ রানা রাব্বানীর বিরুদ্ধে অতীতে বিভিন্ন সময়ে একাধিক মামলা, সাধারণ ডায়েরি, গ্রেপ্তার এবং কারাবাসসংক্রান্ত তথ্য পুলিশের অপরাধ-তথ্য ব্যবস্থায় সংরক্ষিত ছিল।
আবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ২০২১ সাল পর্যন্ত তাঁর নামে থাকা বিভিন্ন মামলার তথ্য সংশ্লিষ্ট পুলিশি তথ্যভাণ্ডারে পাওয়া যেত। পরবর্তীতে ওই তথ্যের একটি অংশ আর দৃশ্যমান না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে মূলত কয়েকটি বিষয়ে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামে কী কী মামলা ও অপরাধসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত ছিল, বর্তমানে কোন তথ্য অনুপস্থিত, কখন এবং কীভাবে সেই পরিবর্তন ঘটেছে, তথ্য পরিবর্তন বা অপসারণের কোনো প্রযুক্তিগত লগ রয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় কারও অনিয়ম বা অননুমোদিত হস্তক্ষেপ ছিল কি না।
একই সঙ্গে পুরোনো তথ্যের সঙ্গে থানার মামলা রেজিস্টার, আদালতের নথি এবং অন্যান্য সরকারি রেকর্ড মিলিয়ে দেখারও দাবি জানানো হয়েছে।
আইজিপির কাছেও তদন্তের আবেদন
বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক বরাবর দেওয়া পৃথক আবেদনে একই ধরনের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
আবেদনকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে থাকা পুরোনো মামলার কিছু তথ্য ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত পুলিশি তথ্যব্যবস্থায় দৃশ্যমান ছিল। পরবর্তীতে এসব তথ্যের একটি অংশ আর পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করা হয়।
তবে আবেদনে তথ্য পরিবর্তন বা অপসারণের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। বরং বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
এ কারণে তদন্তের ক্ষেত্রে সিডিএমএসের পরিবর্তন-সংক্রান্ত লগ, ব্যবহারকারীর প্রবেশের তথ্য, পরিবর্তনের তারিখ ও সময়, অনুমোদনের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাকআপ ডাটা পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।
২০২১ সালের পুলিশ প্রতিবেদনে একাধিক মামলার উল্লেখ
সিডিএমএস নিয়ে অভিযোগের সঙ্গে ২০২১ সালের একটি পুলিশ প্রতিবেদনকে গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বোয়ালিয়া মডেল থানার মামলা নম্বর ৬৫, তারিখ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১-এর একটি মামলায় মাসুদ রানা রাব্বানীকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছিল।
আদালতে পাঠানো পুলিশ প্রতিবেদনে মামলার ঘটনার বিষয়ে বিভিন্ন অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে অনধিকার প্রবেশ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, মারধর, মালামাল নেওয়া এবং বিভিন্ন সামগ্রী ভাঙচুরের মতো অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। পুলিশ প্রতিবেদনে মামলার তদন্তের স্বার্থে আসামিকে জেলহাজতে রাখার আবেদন করা হয়েছিল বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—পুলিশের ওই প্রতিবেদন হচ্ছে মামলার তদন্তকালীন একটি নথি। সেখানে যে অভিযোগগুলো উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোকে আদালতের চূড়ান্ত রায় বা অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
পুরোনো মামলার তালিকাও রয়েছে পুলিশ প্রতিবেদনে
২০২১ সালের ওই পুলিশ প্রতিবেদনের পরবর্তী অংশে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে দায়ের হওয়া কয়েকটি পুরোনো মামলার নম্বর, তারিখ এবং আইনের ধারার উল্লেখ রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
নথিতে ২০১০ সালের মতিহার থানার একটি মামলা, ২০০৭ সালের একটি মাদকসংক্রান্ত মামলা, ১৯৯৯ ও ২০০৩ সালের একাধিক মামলা, বোয়ালিয়া মডেল থানার একটি মামলা এবং ২০০৮ ও ২০১০ সালের সাধারণ ডায়েরির উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ, অন্তত ২০২১ সালের পুলিশ প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী একাধিক মামলা ও জিডির তথ্য উল্লেখ থাকার দাবি নথিভিত্তিকভাবে সামনে এসেছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—ওই সময়ের থানার রেকর্ড, আদালতের নথি এবং পুলিশ প্রতিবেদনে থাকা তথ্যের সঙ্গে বর্তমানে সিডিএমএসে দৃশ্যমান তথ্যের মিল কতটুকু?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে পুরোনো মামলা রেকর্ড এবং বর্তমান ডাটাবেজের তথ্য পাশাপাশি যাচাই করা প্রয়োজন।
‘সিডিএমএস’ ও ‘পিসিপিআর’—কোন তথ্যব্যবস্থায় কী ছিল, সেটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা যাচ্ছে যে, প্রতিবেদনে উত্থাপিত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট নথি, অভিযোগ ও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্তভাবে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করা হচ্ছে না।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগ বা তথ্যের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সাংবাদিক কিংবা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য, ব্যাখ্যা, প্রমাণপত্র বা প্রতিবাদ থাকলে তা দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর কাছে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। যথাযথ তথ্য ও প্রাসঙ্গিক নথিপত্র পাওয়া গেলে তা যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য প্রকাশ করা হবে।
একই সঙ্গে প্রতিবেদনে প্রকাশিত কোনো তথ্য পরবর্তীতে ভুল, অসম্পূর্ণ বা তথ্যগতভাবে অসঙ্গত প্রমাণিত হলে দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর পক্ষ থেকে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধন, ব্যাখ্যা বা প্রত্যুত্তর প্রকাশের সুযোগ রাখা হয়েছে।
আমাদের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্মানহানি করা নয়; বরং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্য ও নথির আলোকে প্রশ্ন তুলে প্রকৃত তথ্য অনুসন্ধানে সহায়তা করা। সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও নতুন তথ্য পাওয়ার পর প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিবেদনে তা যুক্ত বা সংশোধন করা হবে।