সালাউদ্দিন শামিম :
প্রকাশিত: ৫ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ২:১১
বেনাপোল স্থলবন্দর ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস এলাকায় যাত্রীদের ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে নানা অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ যাত্রীদের বহন করা তুলনামূলক কম পরিমাণের পণ্য আটক বা ডিএম (ডিটেনশন মেমো) করার বিপরীতে বড় আকারের ব্যাগ ও ট্রলি নিয়ে আসা কিছু যাত্রীকে বিশেষ সুবিধায় পার করে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন পাসপোর্টধারী যাত্রী।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বেনাপোল ইমিগ্রেশনে দায়িত্ব পালনকারী সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) মোরশেদা রহমান। স্থানীয় সূত্র ও কয়েকজন যাত্রীর দাবি, নির্দিষ্ট কিছু লাগেজ বহনকারী যাত্রীকে চেকিংয়ের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রতি ব্যাগেজে প্রায় ১০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয় এবং এ অর্থ সংগ্রহে কাস্টমসের কয়েকজন সিপাহির নামও আলোচনায় এসেছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এই প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত নিশ্চিত করা যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে কাস্টমসের সিসিটিভি ফুটেজ, ডিউটি রোস্টার, ডিএমের নথি, যাত্রীদের প্রবেশ ও পণ্য পরীক্ষার তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের রেকর্ড পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২ অক্টোবরের ঘটনা নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, গত ২ অক্টোবর বিকেলে ভারত থেকে আসা কয়েকজন যাত্রীর বড় আকারের ব্যাগ ও ট্রলি নিয়ে প্রবেশের ঘটনায় বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। তাদের সঙ্গে প্রসাধনী, শাড়ি ও থ্রিপিসসহ বিভিন্ন পণ্য ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সিপাহি ইমরান ও তৌহিদুলের মাধ্যমে কয়েকজন যাত্রী প্রবেশ করেন এবং তাদের মধ্যে শাপলা হোটেলের মেসিয়ার সাগরের মাধ্যমে আসা প্রসাধনী বহনকারী দুইজন, জোনাব আলীর মাধ্যমে শাড়ি ও থ্রিপিস বহনকারী তিনজন এবং ডলি নামের একজনের প্রসাধনী বহনকারী যাত্রীর কথাও বলা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব যাত্রীর কাছ থেকে প্রতি ব্যাগেজে ১০ হাজার টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সিপাহিদের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে। তবে কার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে এবং ওই অর্থের কোনো লেনদেন বাস্তবে হয়েছে কি না—এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো নথি বা প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।
৩ অক্টোবর দায়িত্বে ছিলেন অন্য কর্মকর্তা
সূত্রের দাবি, ৩ অক্টোবর রাজস্ব কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম দায়িত্ব পালনকালে কথিত লাগেজ ব্যবসায়ী বা বড় পরিমাণ পণ্য বহনকারী যাত্রীদের তৎপরতা তুলনামূলকভাবে দেখা যায়নি।
অন্যদিকে ৪ অক্টোবর বিকেলে আবারও কয়েকজন যাত্রীর বড় ব্যাগেজ নিয়ে প্রবেশের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন জোনাবের মাধ্যমে দুইজন, ইমরানের মাধ্যমে পাঁচজন এবং হারুনের মাধ্যমে একজন যাত্রী প্রবেশ করেন বলে দাবি করা হয়েছে।
তাদের ব্যাগ ও ট্রলিতে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার প্রসাধনী, শাড়ি ও থ্রিপিসসহ বিভিন্ন পণ্য ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব পণ্যের প্রকৃত মূল্য, শুল্কযোগ্যতা এবং সেগুলো নিয়ম অনুযায়ী ঘোষণা করা হয়েছিল কি না, তা সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সাধারণ যাত্রীদের পণ্য ডিএম করার অভিযোগ
এদিকে কয়েকজন পাসপোর্টধারী যাত্রী অভিযোগ করেছেন, পরিবারের জন্য সামান্য পরিমাণ খাদ্য ও অন্যান্য পণ্য নিয়ে দেশে ফেরার সময় তাদের ব্যাগেজ তল্লাশি করে পণ্য আটক বা ডিএম করা হয়েছে।
পাসপোর্ট নম্বর এ-০৭১৫৫৪৭৭-এর যাত্রী মাহমুদ খান বলেন, ভারত থেকে ফেরার সময় পরিবারের জন্য কেনা চকলেট, বাদামসহ কিছু খাদ্যপণ্য তার সঙ্গে ছিল। তার দাবি, কাস্টমস কর্মকর্তারা সেগুলো বের করে ডিএম করেন। এ সংক্রান্ত স্লিপের নম্বর ৫২২৩৭ বলে তিনি জানান।
তার অভিযোগ, একই সময়ে বড় আকারের ব্যাগ ও ট্রলি বহনকারী কয়েকজন যাত্রীকে তুলনামূলক কম তল্লাশির মধ্য দিয়ে পার হতে দেখা যায়।
পাসপোর্ট নম্বর এ-১৪৪৫৫০৭৫-এর যাত্রী আলাউদ্দীন বলেন, তিনি বাড়ির জন্য প্রায় পাঁচ কেজি খাদ্য ও প্রসাধনী সামগ্রী এনেছিলেন। তার দাবি, ব্যাগ তল্লাশির পর প্রায় চার কেজি পণ্য ডিএম করে রাখা হয়।
তার প্রশ্ন, সাধারণ যাত্রীর অল্প পরিমাণ পণ্য যদি নিয়মের আওতায় আটক করা হয়, তাহলে একই সময় বড় ব্যাগ ও ট্রলি নিয়ে আসা কিছু যাত্রী কীভাবে কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়াই বেরিয়ে যান—এ বিষয়টি কর্তৃপক্ষের তদন্ত করা প্রয়োজন।
আরেক যাত্রী রাজু আহম্মেদ, পাসপোর্ট নম্বর এডি-৯২০৮৫৪৩, বলেন, তিনি মায়ের জন্য ভারত থেকে দুটি শাড়ি এনেছিলেন। তার দাবি, শাড়ি দুটি ডিএম করে রাখা হয়। এ সময় দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তার আচরণ নিয়েও তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
১০ হাজার টাকার চুক্তির দাবি
বেনাপোল ইমিগ্রেশনে পণ্য পারাপারের সঙ্গে জড়িত বলে পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তির দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে ইমিগ্রেশন এলাকায় অতিরিক্ত নজরদারির কারণে বড় পরিমাণ লাগেজ বহনকারী যাত্রীর সংখ্যা কমেছে। তার অভিযোগ, এরপরও বিকেল ও সন্ধ্যার দিকে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে কয়েকজন করে যাত্রীকে ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
ওই ব্যক্তির দাবি, প্রতি যাত্রীর লাগেজের জন্য প্রায় ১০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয় এবং ইমিগ্রেশন পার হওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয়।
তবে ওই ব্যক্তির পরিচয় ও বক্তব্যের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে তার অভিযোগকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা না করে তদন্তযোগ্য দাবি হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
সিপাহি ইমরানের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে কাস্টমস সিপাহি ইমরানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “ম্যাডামের লোক, ম্যাডাম যদি ছাড়ে আমরা কী করব। আমাদের আটকানোর ক্ষমতা নেই।”
কতজন যাত্রীকে তিনি যেতে দেখেছেন জানতে চাইলে তিনি কয়েকজনের কথা উল্লেখ করেন এবং এ বিষয়ে এআরও মোরশেদা রহমানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
তার বক্তব্য থেকেও বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও ভূমিকা পরিষ্কারভাবে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
মোরশেদা রহমানের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে বেনাপোল ইমিগ্রেশনে দায়িত্ব পালনকারী সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মোরশেদা রহমানের সঙ্গে সাংবাদিক পরিচয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আপনার জন্য কী করতে হবে ভাই, সেটা বলেন।”
তিনি আরও জানান, বিষয়টি তিনি তার রাজস্ব কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ইমিগ্রেশনে রয়েছেন।
লাগেজপ্রতি ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি অভিযোগের ব্যাখ্যা না দিয়ে আবারও বলেন, “আপনার জন্য কী করতে হবে সেটা বলেন ভাই।”
তবে তার বক্তব্যে অভিযোগটি সত্য বা মিথ্যা—এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে
বেনাপোল স্থলবন্দর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্থলবন্দর। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী এই পথে ভারত-বাংলাদেশ যাতায়াত করেন। ফলে ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা বৈষম্য থাকলে তা শুধু সরকারের রাজস্ব ক্ষতির কারণ নয়, একই সঙ্গে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যেও ক্ষোভ ও অনাস্থা তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে একই ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে এক যাত্রীর মালামাল আটক এবং অন্য যাত্রীর বড় ব্যাগেজ নির্বিঘ্নে পার হওয়ার অভিযোগ সত্য হলে এর পেছনে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দিনের সিসিটিভি ফুটেজ, ডিউটি রোস্টার, ডিএম স্লিপ, আটক পণ্যের তালিকা, যাত্রীদের ব্যাগেজ তল্লাশির রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনের তথ্য পর্যালোচনা করা হলে অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা বেরিয়ে আসতে পারে। একই সঙ্গে অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথিত আর্থিক লেনদেনের কোনো প্রমাণ থাকলে সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ মনে করে, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়। একই সঙ্গে অভিযোগটি যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে সরকারি রাজস্ব ও যাত্রীসেবা স্বার্থে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট এআরও মোরশেদা রহমান, সিপাহি ইমরান, তৌহিদুলসহ প্রতিবেদনে উল্লিখিত যেকোনো ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ব্যাখ্যা, প্রমাণপত্র কিংবা প্রতিবাদলিপি প্রকাশের জন্য যথাযথ সুযোগ থাকবে। পরবর্তীতে কোনো তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ প্রমাণিত হলে তা যাচাই সাপেক্ষে সংশোধন বা সংযোজন করা হবে।