গৌরাঙ্গ বিশ্বাস, বিশেষ প্রতিনিধি
টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা ২০২৬ শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্যাপনের লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পূজা মণ্ডপের কমিটির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় উপজেলার ১৮৪টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রতিটি মণ্ডপে শতভাগ সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, দর্শনার্থীদের নিরাপদ চলাচল এবং যানবাহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন কালিহাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আক্তার। এ সময় উপজেলা প্রশাসন, থানা পুলিশ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, পূজা উদ্যাপন ফ্রন্টের প্রতিনিধি, সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন পূজামণ্ডপের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রতিটি পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি দুর্গোৎসব চলাকালে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে মন্দির কমিটি, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানানো হয়।
১৮৪ পূজামণ্ডপ ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি
কালিহাতী উপজেলায় এ বছর মোট ১৮৪টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা উদ্যাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে সভায় জানানো হয়। প্রতিটি মণ্ডপে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং পূজার আনুষ্ঠানিকতা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়।
দুর্গাপূজা শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবই নয়, এটি বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সামাজিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। প্রতি বছর পূজার সময় বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী মণ্ডপ পরিদর্শনে আসেন। ফলে পূজার আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, চলাচলের সুবিধা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সভায় এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি পূজামণ্ডপের নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। মণ্ডপ কমিটির সদস্যদের দায়িত্ব বণ্টন, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ সচল রাখা এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়।
প্রতিটি মণ্ডপে শতভাগ সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের আহ্বান
সভাপতির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার উপজেলার সব পূজামণ্ডপের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের প্রতিটি মণ্ডপে শতভাগ সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
তিনি মণ্ডপের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির গুরুত্ব তুলে ধরেন। সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হলে মণ্ডপের প্রবেশপথ, গুরুত্বপূর্ণ স্থান এবং দর্শনার্থীদের চলাচল পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে। পাশাপাশি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহ ও পরিস্থিতি পর্যালোচনাতেও তা সহায়ক হতে পারে।
তবে ক্যামেরা স্থাপনের পাশাপাশি সেগুলো সচল রাখা, প্রয়োজনীয় স্থানে স্থাপন করা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে নজরদারি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। পূজা উদ্যাপন কমিটিগুলোকে এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
জিআর তহবিল থেকে প্রতিটি মণ্ডপে ৬০০ কেজি চাল বরাদ্দের তথ্য
সভায় ২০২৬ সালের শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রতিটি পূজামণ্ডপের জন্য জিআর (গ্রামীণ রিলিফ) তহবিল থেকে ৬০০ কেজি করে চাল বরাদ্দের তথ্য তুলে ধরা হয়।
ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে এ ধরনের সরকারি সহায়তা পূজা উদ্যাপনের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বরাদ্দের পরিমাণ, অনুমোদন এবং বিতরণসংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট সরকারি নথির মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বরাদ্দ যথাযথভাবে পৌঁছানো এবং নির্ধারিত উদ্দেশ্যে ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কমিটি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা
মতবিনিময় সভায় পূজামণ্ডপের সার্বিক নিরাপত্তা, উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দর্শনার্থীদের নিরাপদ চলাচল, যানবাহন ব্যবস্থাপনা এবং সম্ভাব্য জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়।
সভায় উপস্থিত কালিহাতী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাইয়ুম খানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে পূজা মণ্ডপের কমিটিগুলোর সমন্বয়ের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
পূজার সময় মণ্ডপ এলাকায় অতিরিক্ত জনসমাগম, যানজট কিংবা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তা দ্রুত মোকাবিলা করার জন্য আগাম প্রস্তুতি প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে মণ্ডপ কমিটি, স্বেচ্ছাসেবক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন এবং পুলিশের মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থা কার্যকর রাখা জরুরি।
সভায় যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে অবহিত করার জন্য মন্দির কমিটির সদস্যদের আহ্বান জানানো হয়। এতে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেন।
যানবাহন ব্যবস্থাপনা ও দর্শনার্থীদের নিরাপদ চলাচল
দুর্গোৎসব চলাকালে পূজামণ্ডপগুলোতে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বাড়তে পারে। এ কারণে মণ্ডপসংলগ্ন সড়কে যানবাহন চলাচল, পার্কিং, পথচারীদের নিরাপত্তা এবং জরুরি যানবাহনের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও জনবহুল এলাকায় অবস্থিত পূজামণ্ডপগুলোর সামনে যানজট এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ সচল রাখা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণে স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিশু, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধী দর্শনার্থীদের চলাচলের সুবিধার দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে জরুরি প্রয়োজনে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সেবার সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশাসনের সহযোগিতার আশ্বাস
সভায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শারদীয় দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণভাবে উদ্যাপনে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ এবং সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়। উৎসব চলাকালে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত জানানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
প্রশাসনের এ ধরনের সমন্বয়মূলক উদ্যোগ পূজা মণ্ডপগুলোর প্রস্তুতি পর্যালোচনা, সম্ভাব্য সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারে সহায়ক হতে পারে। তবে মাঠপর্যায়ে এসব সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের ওপর উৎসবের নিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভর করবে।
সভায় রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শুকুর মাহামুদ, কালিহাতী উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি; মোজাম্মেল হক হিরো, বিএনপির উপজেলা কৃষক দলের সাবেক সভাপতি; কালিহাতী উপজেলা পূজা উদ্যাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক মানিক সাহা চৌধুরী; সদস্যসচিব সুজিত দত্ত; এলেঙ্গা পৌরসভা পূজা উদ্যাপন ফ্রন্টের সভাপতি ও পটল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবু রমেন্দ্রনাথ সাহা; ইঞ্জিনিয়ার শহিদুল ইসলাম এবং সাবেক ইউপি সদস্য হারুন অর রশিদ।
এ ছাড়া জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার কালিহাতী ইউনিটির সভাপতি মহসিন হাবিব সবুজ, সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক বিপ্লব সরকার এবং মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা সাবিনা আক্তারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা অংশ নেন। তাঁদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে পূজার প্রস্তুতি, নিরাপত্তা এবং উৎসব ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
সম্প্রীতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রত্যাশা
বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ শারদীয় দুর্গাপূজা। এ উৎসবকে ঘিরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সহযোগিতা ও সম্প্রীতির পরিবেশ আরও সুদৃঢ় করার প্রত্যাশা রয়েছে।
কালিহাতীতে ১৮৪টি পূজামণ্ডপকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ মতবিনিময় সভায় নিরাপত্তা, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, সরকারি সহায়তা এবং প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এখন সভায় আলোচিত বিষয়গুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন, পূজামণ্ডপগুলোর প্রস্তুতি সম্পন্ন করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখাই হবে সংশ্লিষ্টদের অন্যতম দায়িত্ব।
প্রশাসন, পূজা উদ্যাপন কমিটি, স্থানীয় জনগণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্মিলিত উদ্যোগে কালিহাতীতে শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
জনতার কণ্ঠস্বর
#কালিহাতী #টাঙ্গাইল #শারদীয়দুর্গাপূজা২০২৬ #দুর্গোৎসব #পূজামণ্ডপ #ফারজানাআক্তার #কালিহাতীউপজেলাপ্রশাসন #আইনশৃঙ্খলা #সিসিটিভিক্যামেরা #ধর্মীয়সম্প্রীতি #গৌরাঙ্গবিশ্বাস #দৈনিকবাংলাদেশপ্রথমসংবাদ