রাউজানের কদলপুরে মূর্তমান আতঙ্ক ‘চিটিং এনাম’: প্রবাসীদের টাকা আত্মসাৎ ও আওয়ামী দোসরদের মদদদাতার খুঁটির জোর কোথায়?
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাউজান | চট্টগ্রামের রাউজান থানার অন্তর্গত কদলপুর ইউনিয়নের সমশের পাড়া এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে এক কুখ্যাত আন্তর্জাতিক দালাল ও প্রতারক, যার নাম এনাম (ওরফে চিটিং এনাম)। আন্তর্জাতিক দোভাষী পরিচয় দিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করলেও তার আসল চেহারা একজন পেশাদার বাটপার ও রাজনৈতিক সুবিধাবাদীর। অভিযোগ উঠেছে, বিদেশের মাটিতে ভিসা জালিয়াতি থেকে শুরু করে দেশের মাটিতে আওয়ামী ক্যাডারদের সুরক্ষা দেওয়া—সবখানেই তার বিচরণ।
শারজাহ ও ওমানে প্রতারণার স্বর্গরাজ্য
অনুসন্ধানে জানা যায়, এনাম দীর্ঘ সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাতে অবস্থানকালে সাধারণ প্রবাসীদের সাথে চরম প্রতারণা করেন। ভিসা দেওয়ার নাম করে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে সে ওমানে পালিয়ে যায়। সেখানেও একই ধরণের প্রতারণা করে বর্তমানে সে এলাকায় এসে নিজেকে প্রভাবশালী হিসেবে জাহির করছে। তার এই আন্তর্জাতিক প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক প্রবাসী আজ সর্বস্বান্ত।
৫ই আগস্টের ‘রক্ষাকর্তা’ ও দ্বিমুখী রাজনীতি
গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের রাতে এনামের আসল চেহারা উন্মোচিত হয়। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সেই রাতে সে চিহ্নিত আওয়ামী দালাল গনি হুজুরের ছেলে তামিম এবং তার চাচা আলতাফ হোসেন (প্রকাশ আন্ডা)-কে ফোন করে সতর্ক করে দেয় এবং তাদের গুচ্ছগ্রামের পাহাড়ে আত্মগোপন করতে সাহায্য করে। এই সংক্রান্ত অডিও ক্লিপ এখন সাধারণ মানুষের হাতে হাতে ঘুরছে।
আওয়ামী শাসনামলে আলমগীর মেম্বরের ছত্রছায়ায় থেকে সুবিধা নিলেও বর্তমানে সে ভোল পাল্টে ফেলেছে। দিনের বেলা গোলাম আকবর খন্দকার গ্রুপের নাম ভাঙিয়ে চললেও রাতের আঁধারে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী গ্রুপের সাথে আঁতাত করে দলের ভেতরে বিভাজন সৃষ্টি করছে। তার এই ‘পেট নীতি’ ও সুবিধাবাদী রাজনীতির কারণে ত্যাগী কর্মীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।
মেয়ের বিয়ের নামে প্রবাসীদের দ্বারে দ্বারে ‘চাঁদাবাজি’
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এনামের নৈতিক স্খলন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নিজের মেয়ের বিয়ের খরচ জোগাতে সে সমশের পাড়ার প্রবাসীদের ফোন করে ভিক্ষার মতো টাকা চেয়ে বেড়িয়েছে। বিয়ের নাম করে তোলা সেই টাকা দিয়ে সে বর্তমানে মদ ও জুয়ার আসর বসিয়ে আয়েশি জীবন যাপন করছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।
সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
টাকার বিনিময়ে যারা এই ধরণের চিহ্নিত দালাল ও অনুপ্রবেশকারীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। এলাকাবাসীর মতে, এনামের মতো লোক সমাজে ও রাজনীতিতে যত দিন থাকবে, তত দিন সাধারণ মানুষ নিরাপদ নয়।
এই কুখ্যাত দালালের বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে কদলপুরবাসী।
নিচে তার অপরাধ অনুযায়ী যে ধরণের শাস্তি হওয়া উচিত বলে এলাকার মানুষ দাবি।
১. রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক শাস্তি
যেহেতু সে দলের মধ্যে ঢুকে বিভেদ সৃষ্টি করছে এবং ৫ই আগস্টের পলাতক আসামিদের সাহায্য করেছে:
আজীবন বহিষ্কার: তাকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সকল ধরণের রাজনৈতিক পরিচয় থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা।
অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিতকরণ: দলীয় কার্যালয়গুলোতে তার ছবি টাঙিয়ে তাকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করা যাতে ভবিষ্যতে কোনো গ্রুপ তাকে ব্যবহার করতে না পারে।
আশ্রয়দাতাদের বিচার: যারা টাকার বিনিময়ে তাকে দলে জায়গা দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দলীয় শোকজ (Show cause) এবং সাংগঠনিক পদাবনতি নিশ্চিত করা।
২. আইনি শাস্তি (ফৌজদারি অপরাধের জন্য)
তার বিরুদ্ধে থানায় সুনির্দিষ্ট মামলা করা যেতে পারে:
প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাৎ মামলা: প্রবাসীদের থেকে যে টাকা সে হাতিয়ে নিয়েছে, তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০ ধারা (প্রতারণা) এবং ৪০৬ ধারা (বিশ্বাসভঙ্গ) মোতাবেক মামলা হওয়া উচিত।
অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়ার অপরাধ: ৫ই আগস্টের আসামিদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করার অপরাধে তাকে দণ্ডবিধির ২১২ ধারা অনুযায়ী অপরাধীকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার করা উচিত।
ভিসা জালিয়াতির মামলা: আন্তর্জাতিকভাবে যে ভিসা প্রতারণা করেছে, তার জন্য পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন আইনে কঠোর বিচারের মুখোমুখি করা।
৩. সামাজিক শাস্তি
এলাকার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে পারে:
সামাজিক বয়কট: এলাকার কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে বা সালিশি বৈঠকে তাকে অংশ নিতে না দেওয়া।
ক্ষতিপূরণ আদায়: প্রবাসীদের কাছ থেকে ‘ভিক্ষা’ বা প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া টাকা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে সালিশ করে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
নজরদারি: তার বর্তমান আয়ের উৎস এবং রাতের বেলার সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড নিয়ে স্থানীয় থানাকে লিখিতভাবে অবহিত রাখা।