মোরেলগঞ্জ-শরণখোলায় ‘নৌকা’র মাঝিকে ধানের শীষের টিকিট! সোমনাথ দে-র মনোনয়ন নিয়ে তৃণমূলে বিদ্রোহের আগুন
নিজস্ব প্রতিবেদক, মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ তারিখ: ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫
বিগত ১৫ বছরের আওয়ামী দুঃশাসনে যখন মোরেলগঞ্জ-শরণখোলার (বাগেরহাট-৪) মাঠপর্যায়ের বিএনপি নেতাকর্মীরা হামলা, মামলা আর নির্যাতনে ঘরছাড়া ছিলেন, ঠিক তখনই আওয়ামী লীগের তল্পিবাহক হিসেবে পরিচিত জনৈক ‘রাজনৈতিক ডিগবাজি পটু’ নেতার বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রাপ্তির খবরে এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি আর কেউ নন, আলোচিত-সমালোচিত নেতা সোমনাথ দে।
সম্প্রতি বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন তালিকায় তার নাম আসায় ক্ষোভে ফুঁসছে স্থানীয় তৃণমূল। দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর দীর্ঘ অনুসন্ধানে সোমনাথ দে-র রাজনৈতিক ভোলবদল এবং আওয়ামী লীগের সাথে তার গভীর সখ্যতার অসংখ্য চাঞ্চল্যকর তথ্য ও স্থিরচিত্র উঠে এসেছে।
আওয়ামী লীগের পদধারী নেতা যখন বিএনপির প্রার্থী
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সোমনাথ দে কেবল আওয়ামী লীগের সমর্থকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ কমিটির ৩ নম্বর কার্যনির্বাহী সদস্য। ২০২২ সালে ঘোষিত আওয়ামী লীগের দলীয় প্যাডে তার নাম স্পষ্টভাবে ৩ নম্বরে উল্লেখ রয়েছে। অথচ গত ৫ই আগস্ট পটপরিবর্তনের পর অতি কৌশলে তিনি নিজেকে ‘বিএনপি ঘরানার’ বলে দাবি করতে শুরু করেন।
‘লাঙল’ থেকে ‘নৌকা’, অতঃপর ‘ধানের শীষ’: এক রাজনৈতিক ডিগবাজি
সোমনাথ দে-র রাজনৈতিক ক্যারিয়ার যেন এক ‘সিজনাল পাখি’র গল্প। প্রাপ্ত তথ্যমতে:
জাতীয় পার্টি পর্ব: তিনি জাতীয় পার্টির প্রয়াত চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের আমলে দলটির সংখ্যালঘু বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে ‘লাঙল’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
আওয়ামী লীগ পর্ব: নির্বাচনের পরপরই ভোল পাল্টে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। দলটির প্রভাবশালী মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতাদের আশীর্বাদে উপজেলা কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেন।
বিএনপি পর্ব: গত ২০ আগস্ট তড়িঘড়ি করে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে ফুল দিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন। যোগদানের তিন মাসের মাথায় অলৌকিকভাবে বাগিয়ে নেন দলীয় মনোনয়ন।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর হাতে আসা তথ্যপ্রমাণ
আমাদের হাতে আসা একাধিক ছবিতে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতা থাকাকালীন সময়ে সোমনাথ দে স্থানীয় আওয়ামী সংসদ সদস্য এবং প্রভাবশালী মন্ত্রীদের সাথে একান্ত বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন। এমনকি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মিছিলে এবং দলীয় কর্মসূচিতে তাকে প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি আওয়ামী লীগের হয়ে গত কয়েকটি নির্বাচনে বিএনপির ভোট বর্জনের প্রচারণায় সক্রিয় ছিলেন।
অভিযোগের পাহাড়: জমি দখল ও দালালি
সোমনাথ দে-র বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ রয়েছে: ১. দালালি ও মামলা বাণিজ্য: আওয়ামী লীগের আমলে তিনি বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে মামলা দিতে পুলিশকে উস্কানি দিতেন বলে অভিযোগ তৃণমূলের। ২. গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টতা: বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার নাম ভাঙিয়ে তিনি স্থানীয় সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও ভয়ভীতি দেখাতেন। ৩. আদর্শিক বিচ্যুতি: কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের তোয়াক্কা না করে কেবল ‘পদের লোভে’ তিনি বারবার দল পরিবর্তন করেছেন, যা সুস্থ রাজনীতির জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।
তৃণমূল বিএনপির হুংকার
সোমনাথ দে-র মনোনয়ন পাওয়ার খবরে মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলায় ঝাড়ু মিছিল ও বিক্ষোভ করেছেন দলের ত্যাগী কর্মীরা। স্থানীয় এক প্রবীণ বিএনপি নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সকালে জাপ্পা, দুপুরে লীগ আর রাতে বিএনপি হওয়া এই ডিগবাজি সোমনাথকে আমরা চিনি। যে লোক নৌকার সুবিধা ভোগ করে আমাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে, তাকে ধানের শীষ দেওয়া মানে শহীদদের রক্তের সাথে বেইমানি করা।”
সোমনাথ দে-র বক্তব্য
এসব অভিযোগের বিষয়ে সোমনাথ দে-র সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “আমি সবসময় অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। আমার বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন।” তবে তার এই বক্তব্যের বিপরীতে আওয়ামী লীগের পদধারী হওয়ার দালিলিক প্রমাণ উপস্থিত থাকায় স্থানীয় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে চরম হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর মন্তব্য: আদর্শহীন এই রাজনৈতিক ডিগবাজি বন্ধ না হলে মোরেলগঞ্জ-শরণখোলার মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনে বিএনপির জনসমর্থন ধসে পড়তে পারে। ‘আওয়ামী ভাইরাস’ খ্যাত এসব হাইব্রিড নেতাদের রুখতে বিএনপির হাইকমান্ড কি কোনো ব্যবস্থা নেবে? নাকি ত্যাগীদের রক্ত মাড়িয়ে সোমনাথ দে-র মতো ‘সিজনাল পাখি’রাই উড়ে বসবে ধানের শীষে?