মিরপুর ইস্টার্ন হাউজিংয়ে তিতাস গ্যাসের ‘ওপেন সিক্রেট’ লুটের সাম্রাজ্য
প্রতিবেদক: ইনভেস্টিগেশন টিম তারিখ: ১০ জানুয়ারি, ২০২৬
ঢাকা: রাজধানীর মিরপুর ইস্টার্ন হাউজিং এবং সংলগ্ন আলুদ্দী এলাকা এখন অবৈধ গ্যাস সংযোগের এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সরকারের কয়েকশ কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ গ্যাস দিনের আলোতে লুট করে নিচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে উঠে এসেছে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি শফিক (ওরফে শফিক মাস্টার)-এর নাম। তিতাস গ্যাসের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এই ‘গ্যাস সাম্রাজ্য’ এখন রাষ্ট্রীয় রাজস্বের জন্য এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
১. শফিক মাস্টারের নেতৃত্বে ‘ছায়া তিতাস’ সিন্ডিকেট
অনুসন্ধানে দেখা যায়, আলুদ্দী এলাকায় তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের সমান্তরাল একটি সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন শফিক মাস্টার। তার অধীনে রয়েছে এক বিশাল ক্যাডার বাহিনী এবং মাঠ পর্যায়ের ‘লাইনম্যান’ যারা অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ তদারকি করে।
চক্রের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ও সহযোগী হিসেবে কাজ করছে:
অভি দাদা, হান্নান, ময়নুল, আক্তার, মোখলেছ, ইমন, শানি, কানা মনির, সাদ্দাম, জাহিদ, দেলোয়ার, মাছুম ও সামছুসহ একঝাঁক দুর্ধর্ষ সদস্য। এই সিন্ডিকেটটি এলাকায় এতটাই প্রভাবশালী যে, এদের অনুমতি ছাড়া এলাকায় নতুন কোনো ঘর বা ফ্যাক্টরি তৈরি হলেও তিতাস কর্তৃপক্ষ সেখানে পৌঁছাতে পারে না।
২. কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি: ওয়াশিং প্ল্যান্ট ও ফ্যাক্টরি
প্রতিবেদনে সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে আলুদ্দী এলাকার ওয়াশিং প্ল্যান্ট ও বড় বড় ফ্যাক্টরিগুলো নিয়ে। কয়েক মাস ধরে অনুসন্ধানে জানা যায়:
অবৈধ শিল্প সংযোগ: বড় বড় ওয়াশিং প্ল্যান্টে তিতাসের মূল লাইন থেকে অবৈধ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। একটি ওয়াশিং প্ল্যান্ট প্রতি মাসে যে পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার করে, তার বাজারমূল্য কয়েক লাখ টাকা। কিন্তু এক টাকাও সরকারি রাজস্বে জমা হচ্ছে না।
বিনিময় মূল্য: প্রতিটি শিল্প সংযোগের জন্য এই সিন্ডিকেট এককালীন ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছে।
মাসিক ‘পকেট মানি’: সংযোগ সচল রাখার জন্য প্রতি মাসে একেকটি ফ্যাক্টরি থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা বা ‘সার্ভিস চার্জ’ আদায় করে শফিক মাস্টারের বাহিনী।
৩. তিতাসের অসাধু কর্মকর্তাদের ‘অশুভ আঁতাত’
সরজমিনে দেখা গেছে, তিতাসের কিছু ভ্রাম্যমাণ টিম মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কিন্তু এটি কেবলই একটি ‘আইওয়াশ’।
অনুসন্ধানের তথ্যমতে: দিনের বেলা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও, সেই রাতেই তিতাসের অসাধু ঠিকাদার ও মাঠকর্মীদের সহযোগিতায় ১ থেকে ৩ লাখ টাকার বিনিময়ে পুনরায় সংযোগ দিয়ে দেয় চোর সিন্ডিকেট। মূলত তিতাস ও শফিক মাস্টার সিন্ডিকেট এখন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
৪. রাজনৈতিক মদদ ও প্রশাসনিক নীরবতা
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় কিছু অসাধু রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও নামধারী জনপ্রতিনিধি এই গ্যাস চুরির মহোৎসবের সরাসরি সুবিধাভোগী। রাজনৈতিক শক্তির ঢাল ব্যবহার করেই শফিক মাস্টার দিনের পর দিন এই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে সাধারণ মানুষ অভিযোগ করতে চাইলেও প্রাণের ভয়ে মুখ খুলছে না।
৫. মৃত্যুফাঁদ: বিস্ফোরণ ও আগুনের ঝুঁকি
অবৈধ সংযোগগুলো দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং মান বা নিরাপত্তা বিধি মানা হচ্ছে না। ফলে আলুদ্দী এলাকায় গ্যাস পাইপ লিক হওয়া একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অপরিকল্পিত ও ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগের কারণে যেকোনো সময় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণ ঘটে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানি হতে পারে।
৬. কর্তৃপক্ষের দায়সারা বক্তব্য
বিষয়টি নিয়ে তিতাস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বরাবরের মতোই বলেন, “সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” কিন্তু মাসের পর মাস ধরে প্রকাশ্যে এই লুটপাট চললেও অদৃশ্য কারণে তিতাস কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
উপসংহার ও বর্তমান অবস্থা
ঢাকার উপকণ্ঠে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের আলুদ্দী এলাকায় শফিক মাস্টারের এই গ্যাস সাম্রাজ্য কেবল অর্থ আত্মসাৎ নয়, বরং রাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। এখনই এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের গ্রেফতার এবং তিতাসের অভ্যন্তরে থাকা ‘ঘরশত্রু বিভীষণ’দের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এই ক্ষত আরও গভীর হবে।
প্রিয় পাঠক, এই মহাচোরদের নাম ও বিস্তারিত তালিকা আমাদের হাতে রয়েছে। অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচনে পরবর্তী সংখ্যায় চোখ রাখুন।