যশোরের মণিরামপুর উপজেলার ভোজগাতী ইউনিয়নে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের ওপর নেমে এসেছে চরম নির্যাতন ও প্রাণনাশের হুমকি। একদিকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাকের গ্রেপ্তার, অন্যদিকে ‘কলস’ প্রতীকের প্রার্থীর পক্ষে সংখ্যালঘু ভোট ব্যাংক দখলে নিতে এক ভয়াবহ তাণ্ডব শুরু হয়েছে। বর্তমানে ওই এলাকার সংখ্যালঘু পরিবারগুলো চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিনাতিপাত করছে।
ভোট না দিলে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার আল্টিমেটাম
সরেজমিনে ভোজগাতী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে এবং স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের সাথে কথা বলে এক শিউরে ওঠার মতো চিত্র ফুটে উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক হিন্দু ধর্মাবলম্বী জানান, তারা এখন নিজ ভূমিতেই পরবাসীর মতো আতঙ্কে আছেন। চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাকের পালিত একদল সন্ত্রাসী বাহিনী বাড়ি বাড়ি গিয়ে শাসিয়ে আসছে যে— “যদি কলস মার্কায় ভোট না পড়ে, তবে ভোট পরবর্তী সময়ে কাউকে বাড়িতে ঘুমাতে দেওয়া হবে না। ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হবে এবং মণিরামপুর থেকে চিরতরে বিতাড়িত করা হবে।”
রাত জেগে ঘর পাহারা দিচ্ছেন সংখ্যালঘু পরিবারগুলো
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক গত শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় কুয়াদা বাজার থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হলেও তার গড়ে তোলা সন্ত্রাসী সিন্ডিকেট এখনো এলাকায় সক্রিয়। তারা প্রতিনিয়ত সংখ্যালঘু পাড়াগুলোতে বাইক মহড়া দিচ্ছে এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করছে। সাধারণ হিন্দুদের আকুতি, “আমরা স্বাধীন দেশে নিজের ভোটটা দিতে চাই, কিন্তু আমাদের বলা হচ্ছে—ভোট না দিলে বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হবে। আমরা এখন ভয়ে মুখ খুলতে পারছি না, রাতের বেলা পালাক্রমে ঘর পাহারা দিচ্ছি।”
পেছনের কারিগর: ৭০ লক্ষ টাকার ‘গোপন আঁতাত’
এই হুমকির নেপথ্যে উঠে এসেছে এক গভীর রাজনৈতিক ও আর্থিক ষড়যন্ত্রের তথ্য। স্থানীয় সূত্র ও রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে যে, জনৈক শহীদ ইকবাল তার ‘কলস’ প্রতীকের জয় নিশ্চিত করতে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের সাথে হাত মিলিয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, এই নির্বাচনী আঁতাতের অংশ হিসেবে রাজ্জাক চেয়ারম্যানের কাছ থেকে ৭০ লক্ষ টাকা গ্রহণ করেছেন শহীদ ইকবাল। মূলত এই বিপুল অর্থের জোরেই ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে সংখ্যালঘু ভোটারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ভোট নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
আওয়ামী লীগ নেতা রাজ্জাক গ্রেপ্তার ও বর্তমান পরিস্থিতি
উল্লেখ্য, গত শনিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে মণিরামপুর থানা পুলিশ কুয়াদা বাজার এলাকা থেকে আব্দুর রাজ্জাককে গ্রেপ্তার করে। তিনি ভোজগাতী ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। মণিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রজিউল্লাহ খান নিশ্চিত করেছেন, তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। রাজ্জাকের গ্রেপ্তারের পর তার সন্ত্রাসী বাহিনী আরও বেপরোয়া হয়ে সাধারণ ভোটারদের ওপর চড়াও হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রশাসনের নীরবতা ও জনমনে ক্ষোভ
বিপুল অর্থ লেনদেন এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাদের ব্যবহার করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার এই অপচেষ্টাকে রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতে, এর ফলে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ‘কলস’ মার্কার গ্রহণযোগ্যতা শূন্যের কোঠায় নেমেছে। অনেকে অভিযোগ করেছেন যে, এই নগ্ন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কঠোর কোনো পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না, যা সন্ত্রাসীদের আরও উসকে দিচ্ছে।
সুষ্ঠু তদন্ত ও নিরাপত্তার দাবি
ভোজগাতী ইউনিয়নের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এখন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে দিশেহারা। তারা এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে এবং ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপার এবং নির্বাচন কমিশনের জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তারা বলছেন, ভোটের নামে তাদের যেন আর দেশত্যাগের হুমকির মুখে পড়তে না হয়।
প্রতিবেদনের মূল পয়েন্টসমূহ (একনজরে):
গ্রেপ্তার: আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক গ্রেপ্তার।
হুমকি: ‘কলস’ মার্কায় ভোট না দিলে হিন্দু পল্লীতে অগ্নিসংযোগ ও দেশত্যাগের আল্টিমেটাম।
লেনদেন: নির্বাচন ঘিরে ৭০ লক্ষ টাকার গোপন আঁতাতের অভিযোগ।
সন্ত্রাস: গ্রেপ্তারকৃত নেতার বাহিনীর মহড়ায় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি।
দাবি: সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তার জোর দাবি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বেক্তির অভিযোগ,
সংখ্যালঘু ও ভোটারদের হুমকির পরিণাম: আইনের চোখে অপরাধীদের সম্ভাব্য কঠোর শাস্তি
মণিরামপুরের ভোজগাতী ইউনিয়নে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া এবং দেশত্যাগের যে হুমকি দেওয়া হচ্ছে, তা বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। এই অপরাধের সাথে জড়িতদের নিম্নোক্ত শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব:
১. ভোটারদের হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের শাস্তি
নির্বাচনী অপরাধ ও আচরণবিধি (Representation of the People Order, 1972): কোনো ভোটারকে ভোট দিতে বাধ্য করা বা ভোট দানে বাধা দেওয়ার জন্য ভয়ভীতি দেখালে তা ‘দুষ্টু প্রভাব বিস্তার’ (Undue Influence) হিসেবে গণ্য হয়।
শাস্তি: এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বনিম্ন ২ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া ওই প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা রাখে নির্বাচন কমিশন।
২. সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার হুমকির শাস্তি
দণ্ডবিধি (Penal Code, 1860): বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি (Criminal Intimidation) এবং সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেওয়া গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।
ধারা ৫০৬: মৃত্যুর হুমকি বা ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিলে অপরাধীর ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
ধারা ৪৩৫ ও ৪৩৬: যদি কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী প্রকৃতপক্ষে আগুন ধরায় বা আগুনের চেষ্টা করে, তবে তাদের ১০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
৩. সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় শাস্তি
যেহেতু ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাককে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেহেতু তার এবং তার বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তির মাত্রা আরও ভয়াবহ হবে।
শাস্তি: সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা অনূর্ধ্ব ২০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে। এছাড়া অর্থদণ্ডেরও বিধান রয়েছে।
৪. অবৈধ অর্থ লেনদেনের শাস্তি (৭০ লক্ষ টাকার অভিযোগ)
নির্বাচনে নির্ধারিত সীমার বাইরে অর্থ খরচ এবং অন্য দলের নেতাকে প্রভাবিত করতে বিশাল অংকের (৭০ লক্ষ টাকা) লেনদেন করা নির্বাচনী আইন ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের পরিপন্থী।
শাস্তি: নির্বাচনী আইন লঙ্ঘনের জন্য প্রার্থীর নির্বাচন সরাসরি বাতিল হতে পারে। পাশাপাশি অবৈধ অর্থের উৎস নিশ্চিত করতে না পারলে মানিলন্ডারিং আইনে ৪ থেকে ১২ বছরের কারাদণ্ড এবং সেই অর্থের দ্বিগুণ জরিমানার বিধান রয়েছে।
৫. দেশত্যাগের হুমকি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের শাস্তি
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে দেশত্যাগের হুমকি দেওয়া রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের শামিল।
শাস্তি: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (বর্তমানে সাইবার নিরাপত্তা আইন) বা বিশেষ ক্ষমতা আইনে এই ধরণের সাম্প্রদায়িক উস্কানির জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে, যা অপরাধীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার আজীবনের জন্য শেষ করে দিতে পারে।
মণিরামপুরের ভোজগাতী ইউনিয়নের সাধারণ ভোটাররা দাবি তুলেছেন, শুধু গ্রেপ্তার নয়, বরং এই ধরণের জঘন্য হুমকির নেপথ্যে থাকা মাস্টারমাইন্ডদের যেন দ্রুত আইনের আওতায় এনে উল্লিখিত শাস্তি নিশ্চিত করা হয়। অন্যথায় এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি চিরতরে বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।