বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
বেনাপোল সীমান্ত থেকে:
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র ও সর্ববৃহৎ আন্তর্জাতিক সীমান্তস্থল বন্দর বেনাপোল। প্রতিদিন এখান দিয়ে শত শত কোটি টাকার আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পরিচালিত হয়। তবে সীমান্ত রক্ষার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জাতীয় নিরাপত্তার জায়গায় দায়িত্বপ্রাপ্ত আনসার বাহিনীর কতিপয় সদস্যের অপকর্মের একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য ফাঁস হতে শুরু করায় পুরো বন্দর এলাকা জুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ১ নম্বর ক্যাম্পে নিয়োজিত আনসার বাহিনীর তিন সদস্য—দেবব্রত (বিব্রত) কুমার, চিহ্নিত চক্রের কারিগর শিমুল এবং তাদের অন্যতম মূল সহযোগী রাজু—এই তিনজনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে গড়ে উঠেছে এক বিশাল, অপ্রতিরোধ্য মাদক সাম্রাজ্য। সরকারি পোশাক এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকার সুযোগ নিয়ে এরা দেশের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক স্থলবন্দরকে কীভাবে মাদকের ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত করেছে, তা নিয়ে এখন তোলপাড় পুরো এলাকা।
মদ, গাঁজা, হিরোইন থেকে ভারতীয় মরণনেশা: সরাসরি কেনাবেচার নেটওয়ার্ক
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেবব্রত, শিমুল ও রাজুর এই চক্রটি কেবল মাদকের চালান পারাপারে সহায়তা করেই ক্ষান্ত হয়নি; তারা সরাসরি এই বিষাক্ত বাণিজ্যের সাথে জড়িত। ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাকের বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ কাজে লাগিয়ে এরা ভারতীয় চালক ও সহকারীদের মাধ্যমে ভারত থেকে দেশে নিয়ে আসছে চালকে চালক মারাত্মক কেমিক্যালভিত্তিক ওষুধ ও নেশা দ্রব্য।
আমদানিকৃত মরণনেশা: ভারতীয় ড্রাইভারদের দিয়ে কৌশলে সরবরাহ করা হচ্ছে ‘টাইডাল’, ‘টাপাল’ এবং ‘টাপেন্টাডল’-এর মতো অত্যন্ত বিপজ্জনক ভারতীয় কেমিক্যাল ট্যাবলেট।
প্রচলিত মাদকের সিন্ডিকেট: একই সাথে মদ, গাঁজা, হিরোইন এবং ফেনসিডিলের মতো মাদকের বড় বড় চালান দেশে এনে তারা সীমান্তসংলগ্ন এলাকা ও স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
রাষ্ট্র প্রদত্ত দায়িত্ব পালনের নামে এরা প্রতিদিন সীমান্তে সরকারি পোশাকের মর্যাদা ধূলায় মিশিয়ে সরাসরি মাদক কেনাবেচা এবং সরবরাহের মূল কাজ পরিচালনা করে আসছে।
বিশাল অর্থবিত্ত, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বিকাশ ও গোপন হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজিং
এই তিন আনসার সদস্য ও তাদের বাহিনীর অবৈধ উপার্জনের লেনদেন অত্যন্ত সুসংগঠিত। অনুসন্ধানে এদের অর্থ পাচার ও জমানোর বেশ কিছু গোপন মাধ্যম চিহ্নিত হয়েছে:
১. পারিবারিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট: মাদক বাণিজ্যের বিপুল পরিমাণ টাকা জমা করা হয় তাদের নিজেদের নামে এবং তাদের স্ত্রীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে।
২. মোবাইল ব্যাংকিং তদারকি: স্থানীয় বিকাশ ও নগদ এজেন্টদের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা তাদের স্বজনদের নাম্বারে লেনদেন করা হয়েছে।
৩. গোপন হোয়াটসঅ্যাপ নেটওয়ার্ক: চালানের আদান-প্রদান এবং ভারতীয় ড্রাইভারদের সাথে যোগাযোগের জন্য এরা সাধারণ ফোন কলের পরিবর্তে এনক্রিপ্টেড হোয়াটসঅ্যাপ কল ও চ্যাট ব্যবহার করত।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তিন আনসার সদস্য, তাদের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব পরীক্ষা করার পাশাপাশি তাদের ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বার ও হোয়াটসঅ্যাপের কল ডিটেইলস রেকর্ড (CDR) এবং আর্থিক ডেটা পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করলেই এই বিশাল অপরাধের শতভাগ সুনির্দিষ্ট দালিলিক প্রমাণ বেরিয়ে আসবে।
পেছনে কি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও স্বৈরাচারের প্রেতাত্মা? জনমনে তীব্র প্রশ্ন
সাধারণ মানুষের মনে আজ চরম ক্ষোভের সাথে গভীর প্রশ্ন জেগেছে—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোশাকে থেকে কীভাবে এরা এমন দুঃসাহস পেল? মাদক দিয়ে দেশের যুবসমাজকে পঙ্গু করে দেওয়া এবং সীমান্ত বন্দর এলাকাকে অস্থিতিশীল করার পেছনে কি রাজনৈতিক কোনো গভীর অভিসন্ধি রয়েছে?
এজেন্ট হিসেবে কাজের সন্দেহ: সাধারণ মানুষের মধ্যে আজ ওপেন সিক্রেট আলোচনা চলছে—এরা কি পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের গোপন এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে?
রাষ্ট্রকে ধ্বংসের চক্রান্ত: মাদকের বিষ ছড়িয়ে পুরো দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়ে অরাজক পরিবেশ তৈরি করা এবং দেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাসনকে আবার পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় বসানোর কোনো পরিকল্পনা এতে জড়িয়ে আছে কি না—তা এখন গভীর অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
জনগণের বক্তব্য: স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষুব্ধ মন্তব্য, “যে বাহিনীর সদস্য সরাসরি হিরোইন, ফেনসিডিল ও মরণনেশার ব্যবসা করতে পারে, তারা তো অর্থের বিনিময়ে দেশের যেকোনো জাতীয় নিরাপত্তা বিকিয়ে দিতে পারে।”
অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ ও কঠিন আইনি ধারায় মামলার দাবি
দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দরকে মাদক সাম্রাজ্য বানিয়ে এবং রাষ্ট্রকে হুমকির মুখে ফেলে এরা যে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছে, তা বাজেয়াপ্ত করার জোর দাবি উঠেছে।
কঠোর আইনি ধারা প্রয়োগ: এদের বিরুদ্ধে কেবল চাকরি থেকে বহিস্কার নয়, বরং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর কঠোরতম ধারা এবং অবৈধ অর্থ উপার্জনের অপরাধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর আওতায় নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হবে।
সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত: মাদক বাণিজ্যের মাধ্যমে দেবব্রত, শিমুল, রাজু এবং তাদের স্বজনদের নামে অর্জিত সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার জোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
যশোর জেলা কমান্ড্যান্টের কাছে জবাবদিহিতা ও জরুরি পদক্ষেপের আকুতি
বেনাপোল স্থলবন্দরের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং সীমান্ত এলাকাকে মাদকমুক্ত করতে জরুরি ভিত্তিতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে সর্বস্তরের ভুক্তভোগী জনগণ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণ।
তাদের প্রধান দাবিগুলো হলো:
১. অভিযুক্ত আনসার সদস্য দেবব্রত (বিব্রত) কুমার, শিমুল এবং রাজুকে অবিলম্বে দায়িত্ব থেকে ক্লোজ ও বরখাস্ত করা।
২. তাদেরকে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর যশোর জেলা কমান্ড্যান্ট জনাব মাজারুল ইসলাম স্যারের কাছে সরাসরি জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা।
৩. একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে এই চক্রের নেপথ্যে থাকা অন্যান্য মূল হোতাদের মুখোশ উন্মোচন করা।
রিপোর্টের রেড টিম | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ