বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার সংযোগের পরও ‘ভূতুরে বিল’
ক্ষুদ্ধ এলাকাবাসী, সিরিজ রিপোর্ট–১
স্টাফ রিপোর্টার, কুমিল্লা
কুমিল্লা বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের আওতাধীন একাধিক এলাকায় প্রিপেইড মিটার সংযোগের পরও গ্রাহকদের কাছে ‘ভূতুরে বিল’ আসার অভিযোগে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। বকেয়া বিল পরিশোধের পরও মিটার লক হয়ে যাওয়া, টাকা রিচার্জ করতে না পারা এবং অফিসে গিয়ে প্রতিকার না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় গ্রাহকদের দাবি, প্রিপেইড মিটার স্থাপনে দীর্ঘদিন ধরে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। অনেকে বকেয়া বিল পরিশোধ করার পরও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং পুনরায় সংযোগ নিতে জরিমানা ও প্রিপেইড মিটার বসানোর শর্ত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মিটার স্থাপনের কয়েক মাস পরই বড় অঙ্কের অস্বাভাবিক বিল আসছে বলে অভিযোগ।
রমজানে ভোগান্তি চরমে
রমজান মাসে অফিস সময় বিকেল ৩টা পর্যন্ত নির্ধারিত থাকায় অনেক গ্রাহক অভিযোগ নিয়ে গিয়ে অফিস বন্ধ পান। ফলে মিটার লক হয়ে থাকায় সেহেরির সময় বিদ্যুৎ না পেয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে খেতে হয়েছে—এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে।
কয়েকজন গ্রাহক জানান, রিচার্জ করতে না পারায় ফ্রিজে থাকা কাঁচা খাদ্যদ্রব্য নষ্ট হয়েছে। বকেয়া বিল পরিশোধের কাগজ দেখিয়েও মিটার আনলক হওয়ার পর পুনরায় লক হয়ে যাওয়ার ঘটনায় তারা হতবাক।
মিটার রিডারের বিরুদ্ধে অভিযোগ
অভিযোগের তীর উঠেছে মিটার রিডার আনিসের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীরা বলেন, তিনি নাকি ইউনিট জমিয়ে রেখে হঠাৎ বড় অঙ্কের বিল ধরিয়ে দেন। এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন।
উপসহকারী প্রকৌশলী আয়ুব আলী বলেন, লক–আনলক প্রক্রিয়া কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। তিনি দাবি করেন, তার দায়িত্ব মূলত লাইনের কারিগরি সমস্যা দেখা।
অন্যদিকে নির্বাহী প্রকৌশলী পারভেজ বলেন, বিল পরিশোধের তথ্য আপডেট হতে সময় লাগে। তবে কেন বিল পরিশোধের প্রমাণ দেখানোর পরও মিটার পুনরায় লক হলো—এ প্রশ্নে তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে জানান।
প্রতিবেদকের অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে এক রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তির মাধ্যমে ফোন করিয়ে সংবাদ পরিবেশনে প্রতিবন্ধকতার চেষ্টা করা হয়।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক কাঠামো
কুমিল্লা অঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। মাঠপর্যায়ে নির্বাহী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী ও মিটার রিডাররা দায়িত্ব পালন করেন।
গ্রাহক সেবা, বিলিং ও মিটার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম প্রমাণিত হলে তা প্রশাসনিক ও ফৌজদারি—উভয় পর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সম্ভাব্য আইনগত ব্যবস্থা ও শাস্তি
১. ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী অবৈধ আর্থিক সুবিধা গ্রহণ বা ক্ষমতার অপব্যবহার প্রমাণিত হলে ৩ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত হতে পারে।
তদন্ত করবে দুর্নীতি দমন কমিশন।
বিচার হবে বিশেষ জজ আদালতে।
২. গ্রাহকের ক্ষতিসাধন ও প্রতারণা
দণ্ডবিধির ধারা ৪২০ অনুযায়ী প্রতারণা প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে।
তদন্ত করবে থানা পুলিশ বা সিআইডি।
বিচার করবে ফৌজদারি আদালত।
৩. সরকারি দায়িত্বে গাফিলতি
সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি অনুযায়ী বিভাগীয় তদন্ত সাপেক্ষে সাময়িক বরখাস্ত, পদাবনতি বা চাকরিচ্যুতির ব্যবস্থা হতে পারে।
ব্যবস্থা নেবে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়।
৪. তথ্য গোপন বা জালিয়াতি
বিলিং সফটওয়্যার বা ইউনিট কারসাজি প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধির জালিয়াতি সংক্রান্ত ধারায় ৩ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
সচেতন মহলের দাবি
ভুক্তভোগীরা বলছেন, বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও দ্রুত মিটার আনলক নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় সার্ভার অডিট, বিলিং ডাটা পর্যালোচনা এবং গ্রাহক অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি জরুরি।
অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও ফৌজদারি—উভয় ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
সিরিজ রিপোর্টের পরবর্তী পর্বে থাকছে—বিলিং ডাটার অসঙ্গতি ও ভুক্তভোগীদের নথিপত্র বিশ্লেষণ।