বাবার স্মৃতিতে স্তব্ধ শৈশব: হাদির সন্তানের কান্নায় কি রাষ্ট্র জাগবে?
নিজস্ব প্রতিবেদক :
ঢাকা: হাদির মৃত্যুর সংবাদ যখন ঘরে পৌঁছায়, তখন চারপাশ কান্নায় ভেঙে পড়লেও অদ্ভুতভাবে স্তব্ধ হয়ে যায় একটি ছোট্ট প্রাণ—হাদির সন্তান। মৃত্যুর গূঢ় অর্থ বোঝার বয়স তার হয়নি, কিন্তু সে এটুকু বুঝেছে যে, আজ থেকে তার নিরাপত্তার সবথেকে বড় ছাদ—তার বাবা—আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। এই না-ফেরার শূন্যতা শিশুটির জগতকে মুহূর্তেই বিষণ্ণ ও ভীতিকর করে তুলেছে।
শোকের ভাষা যখন নীরবতা
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুদের শোক প্রকাশের ভাষা বড়দের মতো নয়। হাদির সন্তান এখন ভাষার চেয়ে আচরণের মাধ্যমে তার কষ্ট প্রকাশ করছে। কখনো সে বাবার ব্যবহৃত পোশাকে মুখ লুকিয়ে বাবার গায়ের গন্ধ খোঁজে, আবার কখনো গভীর রাতে ‘বাবা’ বলে ডেকে উঠে কারো সাড়া পায় না। তার চোখে এখন কেবলই প্রশ্ন—বাবা কোথায়? কেন সে ফিরছে না? এই প্রশ্নগুলোর কোনো স্বস্তিদায়ক উত্তর দেওয়ার সাহস নেই পরিবারের সদস্যদেরও।
দ্বিগুণ শোকের বোঝা
হাদির সন্তান আজ কেবল বাবা হারানোর বেদনা নয়, বরং এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে পিতৃহীন শৈশব, অন্যদিকে ঝুলে থাকা বিচারের অনিশ্চয়তা। শিশুটি এমন এক পরিবেশে বড় হচ্ছে যেখানে বাবার আদর্শই তার অকাল মৃত্যুর কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এই সত্য যখন সে জানবে, তখন রাষ্ট্রের প্রতি তার বিশ্বাস ও নিজের নিরাপত্তা নিয়ে এক গভীর হীনম্মন্যতা তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
মনস্তাত্ত্বিক ঝুঁকি ও বিশেষজ্ঞ মতামত
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাবার অভাব মানে শিশুর জন্য নিরাপত্তার একটি বিশাল প্রাচীর ধসে পড়া। এর ফলে শিশুর মনে তীব্র অনিশ্চয়তা, অপরাধবোধ এবং ভয় তৈরি হতে পারে। যার প্রভাব পড়ছে তার পড়াশোনা ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার ওপর। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো, শিশুটি যদি বিশ্বাস করতে শুরু করে যে—সত্য বলা বা ন্যায়ের পথে থাকা মানেই শাস্তি পাওয়া, তবে তা একটি প্রজন্মের নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ হবে।
বিবেকের কাছে প্রশ্ন
হাদি আজ নেই, কিন্তু তার সন্তানের চোখে বাবার স্বপ্নগুলো এখনো বেঁচে আছে। এই স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা এখন কেবল পরিবারের নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের বড় দায়। কোনো শিশুর শোক যদি ন্যায়বিচার না পায়, তবে সেই চাপা কান্না একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় রাষ্ট্রকে দাঁড় করাবে।
আজ হাদির সন্তানের এই কান্না কোনো একটি নির্দিষ্ট পরিবারের আর্তনাদ নয়; এটি বর্তমান সময়ের এক গভীর ক্ষত। প্রশ্ন উঠেছে, আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আসলে কেমন দেশ রেখে যাচ্ছি? রাষ্ট্র কি পারবে এই শিশুর চোখের জল মুছে দিয়ে ন্যায়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে?