প্রভাস চন্দ্র রায়: যিনি নেতা থেকে অভিনেতা! ‘গিরগিটি রাজনীতি’ ও ছদ্মবেশের কৌশল নিয়ে দিনাজপুর-১ আসনে চাঞ্চল্য
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন:
গতকাল পর্যন্ত যিনি নিজেকে ‘দেশরত্ন শেখ হাসিনার অনুসারী’ ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার বীর সেনানী হিসেবে জাহির করে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন, আজ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সেই নেতাই বনে গেছেন ‘কট্টর বিএনপি ভক্ত’। দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ ও কাহারোল) আসনের রাজনীতিতে দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক প্রভাস চন্দ্র রায়কে ঘিরে এমন অভিযোগের ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
৫ জুলাই ২০২৪ তারিখের পর থেকেই মূলত নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে নতুন নাটক শুরু করেছেন প্রভাস চন্দ্র রায়। বর্তমানে তিনি সারাক্ষণ বিএনপির হাই-প্রোফাইল নেতাদের পরিচয় দিয়ে বেড়ান—কাউকে নিজের বন্ধু, কাউকে আপন মানুষ আবার কাউকে ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বলে জাহির করেন। দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ এবং স্থানীয়দের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে—৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর নিজেকে বাঁচাতে এবং এলাকায় নিজের প্রভাব ও আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে তিনি রাতারাতি রাজনৈতিক খোলস পাল্টে বিএনপি ঘেঁষা হয়ে উঠেছেন।
যেভাবে অতীতকে আড়াল করার চেষ্টা
সংগ্রহ করা পূর্ববর্তী বিভিন্ন দাপ্তরিক নথিপত্র ও বিজ্ঞাপনী পোস্টার বিশ্লেসণে দেখা যায়:
শারদীয় শুভেচ্ছা ও পোস্টারিং: তিনি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে “স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে ও শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে নৌকার কোনো বিকল্প নেই” স্লোগানে দিনাজপুর-১ আসনে ব্যাপক প্রচারণা চালান।

দলীয় আবেদন ফরম (ক্রমিক নং ২১৮৮): বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের সভাপতি বরাবর আনুষ্ঠানিকভাবে দিনাজপুর-১ আসনে নৌকার প্রার্থী হতে মনোনয়ন আবেদনপত্র জমা দিয়েছিলেন (প্রার্থীর নাম: প্রভাস চন্দ্র রায়, পিতা: মৃত মহেন্দ্র নাথ রায়, স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: মির্জাপুর, ডাকঘর: রামপুর হাট, উপজেলা: কাহারোল, জেলা: দিনাজপুর)।
১৫ আগস্টের শোকবার্তা: ১৫ আগস্টে ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’-এর স্মরণে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করে আওয়ামী লীগের মনোনীত হওয়ার জন্য জোরেশোরে গণসংযোগ করেন।
কিন্তু রাজনৈতিক সমীকরণ পরিবর্তনের সাথে সাথেই তিনি আওয়ামী লীগের সেই আদর্শ ও পরিচয় সম্পূর্ণ ঝেড়ে ফেলে বর্তমানে নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছেন।
“আপার গোপন আদেশ” নাকি পিঠ বাঁচানোর কৌশল?
তৃণমূল নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মনে বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যেখানে রাজপথের হাজারো লড়াকু যুবদল ও ছাত্রদল নেতাকর্মী দীর্ঘ বছর মামলা-হামলায় জর্জরিত ও বেকার হয়ে জীবনযাপন করেছেন, সেখানে কীভাবে একজন চিহ্নিত আওয়ামী লীগ নেতা এখনো নিজের আধিপত্য নির্বিঘ্নে বজায় রেখে চলেছেন?
রাজনৈতিক গুঞ্জন এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, প্রভাস চন্দ্র রায় বর্তমানে নিজেকে বিএনপি ভক্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এক অদ্ভুত ও হাস্যকর কৌশল প্রচার করছেন। তিনি গোপনে লোকজনকে বলছেন—“আপা (শেখ হাসিনা) নাকি নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপির সাথে মিশে ভেতরের খবর নিয়ে বিএনপিকে ধ্বংস করতে হবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি তাঁর ‘দ্বিতীয় ইনিংস’ খেলার এক চরম কৌশলী ছদ্মবেশ। তিনি একদিকে নিজেকে বিএনপির কাছে অনুগত দেখিয়ে পদ-পদবি ও প্রভাব রক্ষা করতে চাইছেন, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নের দাবি তুলে নিজের সাবেক দলীয় অনুসারীদের সহানুভূতি ও বলয় ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
শিক্ষকতার আড়ালে প্রভাব বিস্তার ও যুবসমাজের ক্ষোভ
সহকারী অধ্যাপক হিসেবে একটি শিক্ষকতার পদে অধিষ্ঠিত থেকে প্রভাস চন্দ্র রায় যেভাবে একের পর এক ক্ষমতার রাজনীতি পরিচালনা করে আসছেন, তাতে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে সচেতন মহলে:
শিক্ষকতার পবিত্রতা নাকি রাজনীতির হাতিয়ার: তিনি দীর্ঘ দিন ধরে শিক্ষকতা ও কলেজের পদবী ব্যবহার করে এলাকায় সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন, যা বর্তমানে তাঁর ব্যক্তিগত অপকর্ম ঢাকবার ঢাল হিসেবে কাজ করছে।
বেকার বিএনপি যুবকদের তীব্র হতাশা: বীরগঞ্জ ও কাহারোলের স্থানীয় যুবদলের এক জ্যেষ্ঠ নেতাকর্মী চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান—
“আমরা বিগত ১৫ বছর জেল খেটেছি, বেকার থেকেছি, খেয়ে না খেয়ে রাজপথে লড়াই করেছি। আর এখন যারা নৌকার স্লোগান দিয়ে আমাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল, তারা বিএনপির বড় ভক্ত সেজে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করছে। কীভাবে একজন পদত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতা এসে বিএনপির হাইকমান্ড ও স্থানীয় পর্যায়ে ভিড়ার সুযোগ পায়?”
বর্তমান ভূমিকা ও বড় প্রশ্নচিহ্ন
দিনাজপুর-১ আসনের সাধারণ ভোটার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে আজ কিছু জ্বলন্ত প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে:
একজন ব্যক্তি যিনি প্রকাশ্যে নৌকার প্রতীক পাওয়ার জন্য দলের প্রধানের কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন, তিনি এখন কোন সুবাদে ও কার ছায়ায় এলাকায় এমন প্রভাব খাটাচ্ছেন?
প্রশাসন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে তাঁর এই অনৈতিক ও সুবিধাবাদী প্রভাব কেন অবিলম্বে খর্ব করা হচ্ছে না?
এলাকাবাসীর জোর দাবি, রাজনীতিতে এমন ‘সুবিধাবাদী ও ছদ্মবেশী গিরগিটিদের’ অবিলম্বে চিহ্নিত করে বয়কট করা উচিত। তা না হলে দীর্ঘদিনের ত্যাগী যুবসমাজ ও বিএনপির দুর্দিনের লড়াকু নেতারা তাঁদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার থেকে বারবার বঞ্চিত হতেই থাকবেন।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টি অনুসন্ধান করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রভাস চন্দ্র রায় বা সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। নতুন তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি সংশোধন বা হালনাগাদ করা হবে।
(সংবাদ প্রতিবেদনটির বিস্তারিত অনুসন্ধানের তথ্য, ছবি ও দলিলপত্র সুরক্ষিত ও সংরক্ষিত রয়েছে)