১০ জুলাই ২০২৫
ধর্ম, রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র: শরীফুল ইসলামের অবস্থানের পেছনের বাস্তবতা
ডেস্ক রিপোর্ট: বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে একটি বক্তব্য ঘুরে বেড়াচ্ছে, যেখানে এক ব্যক্তি, শরীফুল ইসলাম নামধারী বক্তা, বাংলাদেশে প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে “কুফরী” ও “তাগুতি” বলে আখ্যায়িত করে ইসলামী শাসনব্যবস্থার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ধর্মীয় যুক্তির ভিত্তিতে বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানান এবং ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার দাবি তোলেন।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই বক্তব্য আদৌ কতটা বাস্তবসম্মত? আর কতটা সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য?
—
সংবিধানের মূলনীতি ও বাস্তবতা
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। সংবিধানের ২(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—“রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমান অধিকার নিশ্চিত করবে।”
অর্থাৎ, বাংলাদেশ ইসলামী ভাবধারার প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও, এটি কোনো শরীয়াহভিত্তিক রাষ্ট্র নয়। সংবিধান ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য করতে নিষেধ করে।
—
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার দাবি: ধর্ম না রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা?
শরীফুল ইসলামের বক্তব্য একটি স্পষ্ট মতাদর্শিক অবস্থান তুলে ধরে। তবে এখানে প্রশ্ন আসে—এই ধরনের আহ্বান কি একটি ধার্মিক সমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে, নাকি এটি নিছক একটি রাজনৈতিক ধারা তৈরির কৌশল?
বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য ইসলামী দল বহু বছর ধরে ইসলামী শাসনব্যবস্থার দাবি জানিয়ে এসেছে। কিন্তু বাস্তবতায়, তাদের রাজনৈতিক চরিত্র ও কর্মকাণ্ডও বহুবার বিতর্কিত হয়েছে—ক্ষমতালোভ, দ্বিচারিতা, এমনকি স্বাধীনতাবিরোধিতার অভিযোগও রয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে।
—
গণতন্ত্র বনাম খিলাফত: বাস্তব কাঠামো কেমন হবে?
ধরা যাক শরীফুল সাহেবের মতামত অনুযায়ী গণতন্ত্র বাতিল করে খিলাফত কায়েম করা হলো—প্রশ্ন হলো, কাদের খিলাফত? কোন মাজহাবের ব্যাখ্যা অনুযায়ী আইন চলবে? কে হবে খলিফা? জনগণের সম্মতি ছাড়া এই পরিবর্তন আরোপ করা কি স্বৈরতন্ত্র নয়?
এমনকি ইসলামী বিশ্বেও রাষ্ট্র পরিচালনার ফর্ম্যাট একরকম নয়—সৌদি আরব, ইরান, তুরস্ক বা মালয়েশিয়া—সব দেশের ধর্মীয় অবস্থান ভিন্ন। ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে মতানৈক্য আছে ওলামা সমাজের মধ্যেও।
—
যুক্তি বনাম তকমা দেওয়ার সংস্কৃতি
শরীফুল সাহেব তার বক্তব্যে যারা আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা সেক্যুলার দলগুলো সমর্থন করে তাদের “তাগুতপন্থী” বা “ঈমানহারা” বলে ইঙ্গিত করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—কার ঈমান কেমন, তা নির্ধারণ করার এখতিয়ার কীভাবে একজন ব্যক্তির হাতে আসে?
এটা একধরনের দাওয়াতি অ্যালার্জি, যেখানে ভিন্ন মতকে ‘কুফর’ ঘোষণা করাই সমাধান হিসেবে ভাবা হয়।
—
সহনশীলতা ও ধর্মীয় গণতন্ত্রের চর্চা প্রয়োজন
বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ জনগণ ইসলামের প্রতি আবেগপ্রবণ, সন্দেহ নেই। কিন্তু ইসলামের নামে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করা, ভিন্নমতকে কাফের বলা, বা ধর্মের ব্যানারে বিভাজন তৈরি করা কেবল চরমপন্থারই জন্ম দেয়।
ইসলাম কখনও দমন-পীড়নের পক্ষে নয়। বরং হুজুর (সা.) মক্কার মুশরিকদের সঙ্গেও শান্তির মাধ্যমে সহাবস্থান করেছেন। ইতিহাস বলে, নবীজী কখনো অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপর ইসলাম চাপিয়ে দেননি।
—
উপসংহার: মতপ্রকাশ হোক দায়িত্বপূর্ণ ও সংবিধানসম্মত
প্রত্যেক নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকার আছে। তবে সেটা যদি হয় উসকানিমূলক, বিভাজন সৃষ্টিকারী এবং সংবিধানবিরোধী—তবে তা শুধু রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং ইসলামকেও একটি ভুল ব্যাখ্যার বলি করে।
ইসলাম কারো ব্যক্তিগত অস্ত্র না—এটি সকলের শান্তি, সুবিচার ও সহনশীলতার জন্য।
প্রতিক্রিয়া, মতামত কিংবা পাল্টা বক্তব্য পাঠাতে পারেন আমাদের অফিসিয়াল মেইলে অথবা ইনবক্সে।