দেবিদ্বার জেনারেল হাসপাতালে জালিয়াতির সাম্রাজ্য: ৩ বছর ধরে ভূয়া টেকনিশিয়ানের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি, নাটক পাল্টে ধামাচাপার অপচেষ্টা!
নিজস্ব প্রতিবেদক | কুমিল্লা:
মানবসেবার পবিত্র ব্রত নিয়ে পরিচালিত চিকিৎসালয় আজ যখন বাণিজ্যের আখড়ায় পরিণত হয়, তখন সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের সীমা থাকে না। কুমিল্লার দেবিদ্বারে ডা. শাহীন আলম পরিচালিত ‘দেবিদ্বার জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’-এ সম্প্রতি এমনই এক ভয়ংকর ও নজিরবিহীন জালিয়াতির চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে বছরের পর বছর ধরে ভুয়া সনদে রমরমা ল্যাব টেস্ট বাণিজ্য এবং চরম জনস্বাস্থ্যবিরোধী অপরাধের ঘটনায় পুরো জেলায় তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। অপরাধ প্রকাশের পর এখন চলছে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার এক নতুন থিয়েটার বা রহস্যজনক নাটক।
হৃদয়বিদারক প্রতারণা: ৩ বছর ধরে চলছে ভুয়া টেকনিশিয়ানের রাজত্ব
অনুসন্ধানে জানা যায়, দেবিদ্বার জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কর্ণধার ডা. শাহীন আলম নিজের ল্যাব ও ডায়াগনস্টিক বিভাগ সচল রাখতে কোনো বৈধ বা সরকারিভাবে নিবন্ধিত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেননি। এর পরিবর্তে সম্পূর্ণ জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে এক ব্যক্তিকে ভুয়া সার্টিফিকেট তৈরি করে দিয়ে ল্যাবের প্রধান টেকনিশিয়ান হিসেবে বসিয়ে দেওয়া হয়।
দীর্ঘ তিন বছর ধরে এই ভুয়া টেকনিশিয়ান সাধারণ রোগীদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ, এক্স-রে, বায়োকেমিস্ট্রি থেকে শুরু করে বিভিন্ন জটিল প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আসছেন। ভুল বা অপেশাদার হাতে পরিচালিত এসব পরীক্ষার মাধ্যমে শত শত মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছে। অথচ সাধারণ রোগীরা কখনো ঘুণাক্ষরেও টের পাননি যে, তাদের জীবন রক্ষাকারী রোগ নির্ণয়ের রিপোর্টগুলো প্রস্তুত করছে এক সার্টিফিকেটধারী জালিয়াতি চক্রের সদস্য।
সবার সামনে স্বীকারোক্তি এবং ভাইরাল ভিডিওর সত্যতা
ঘটনার সত্যতা বেরিয়ে আসে যখন স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা বিষয়টি ধরে ফেলেন। গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, দেবিদ্বার মালিক সমিতির উপস্থিতিতে শত শত মানুষের সামনে ওই ভুয়া টেকনিশিয়ান অকপটে নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন।
তিনি সবার সম্মুখে স্পষ্টভাবে বলেছেন:
তার মেডিকেল টেকনোলজিস্টের সার্টিফিকেটগুলো সম্পূর্ণ জাল এবং তৈরি করা।
হাসপাতালের মূল কর্তৃপক্ষ ডা. শাহীন আলম নিজেই তাকে এই জালিয়াতি সার্টিফিকেট তৈরি করে দিয়েছিলেন এবং প্রতিষ্ঠানে বহাল তবিয়তে চাকরি দিয়েছেন।
উক্ত লাইভ স্বীকারোক্তির ভিডিওটি মুহূর্তের মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং চারদিকে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
নতুন নাটক ও রহস্যজনক সুর বদল: হোয়াটসঅ্যাপ কলের নেপথ্য কাহিনী
প্রকাশ্য আদালতে বা সমিতির সামনে অপরাধ স্বীকারের পর আইনগত ও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও রহস্যজনকভাবে তা করা হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, প্রথমে মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়ার নাম করে মূল অপরাধী ডা. শাহীন আলমকে বাঁচানোর বিশাল পরিকল্পনা আঁকা হয়।
হাসপাতালের সম্মান ও ডা. শাহীনের পার পাওয়ার উপায় হিসেবে পরবর্তীতে সাজানো হয় এক নতুন নাটক। হোয়াটসঅ্যাপ কলের মাধ্যমে ওই ভুয়া টেকনিশিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে মোটা অঙ্কের অর্থের লোভ এবং বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে বক্তব্য পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হয়। নতুন সেই ভয়েস রেকর্ডে জোরপূর্বক বলানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে—সে নাকি সেদিন শুধু নিজেকে বাঁচাতে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা বলেছিল, আসলে কর্তৃপক্ষ তাকে কোনো সার্টিফিকেট বানিয়ে দেয়নি!
টাকার জোরে সত্য ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা: জনগণের তীব্র প্রতিক্রিয়া
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, জনস্বাস্থ্য নিয়ে এমন মারাত্মক অপরাধের ঘটনা ধামাচাপা দিতে এবং প্রশাসনের হাত থেকে বাঁচতে বড় অংকের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। প্রথমে প্রকাশ্যে অপরাধ স্বীকার করলেও পরবর্তীতে টাকার প্রলোভনে পড়ে বক্তব্য পরিবর্তন করানো অত্যন্ত নিন্দনীয় ও হাস্যকর এক তামাশা।
এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীদের জোরালো প্রশ্ন—
“সবার সামনে শত শত মানুষের উপস্থিতিতে দেওয়া সেই লাইভ স্বীকারোক্তি কি তবে নিছক নাটক ছিল? নাকি এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছে কোনো শক্তিশালী অপরাধ সিন্ডিকেট?”
অবিলম্বে গ্রেফতার ও কঠোর শাস্তির দাবি
একটি জীবন রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানে এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ জালিয়াতি এবং পরবর্তীতে টাকার জোরে পার পেয়ে যাওয়ার ঘটনায় সাধারণ মানুষের আস্থা এখন তলানিতে ঠেকেছে। সচেতন মহল ও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে নিম্নলিখিত দাবিগুলো জোরালোভাবে উত্থাপন করা হয়েছে:
১. তাৎক্ষণিক গ্রেফতার: ভুয়া সার্টিফিকেট সরবরাহকারী মূলহোতা ডা. শাহীন আলম এবং জালিয়াতির সাথে জড়িত ভুয়া টেকনিশিয়ানকে অবিলম্বে গ্রেফতার করতে হবে।
২. উচ্চপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত: এই পুরো চক্রের শেকড় কতদূর বিস্তৃত, তা উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
৩. লাইসেন্স বাতিল ও সীলগালা: যে হাসপাতাল মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে, সেই দেবিদ্বার জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স চিরতরে বাতিল করে অবিলম্বে সিলগালা করতে হবে।
৪. অর্থ লেনদেন ও ধামাচাপাকারীদের বিচার: হোয়াটসঅ্যাপ কল রেকর্ড বানিয়ে যারা সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
জনসাধারণ ও ভুক্তভোগীরা এখন প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপে এই কুচক্রী মহলের দ্রুত বিচার দেখতে চান। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন তারা।