জান্নাত এন্টারপ্রাইজের ভয়াবহ জালিয়াতি: বেনাপোলে ১ কোটি টাকার ইলিশ আটক, নেপথ্যে শক্তিশালী সিন্ডিকেট
বেনাপোল প্রতিনিধি | বার্তা২৪.কম বুধবার, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
বেনাপোল: দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে মিথ্যা ঘোষণার আড়ালে পণ্য আমদানির নামে ভয়াবহ জালিয়াতির ঘটনা ফাঁস হয়েছে। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘জান্নাত এন্টারপ্রাইজ’ কর্তৃক ভারত থেকে পাচার করে আনা ৫৩ কার্টন ইলিশের একটি বিশাল চালান আটক করেছে কাস্টমস ও বিজিবি। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) দিবাগত গভীর রাতে বন্দরের ৩১ নম্বর ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ডে এই রুদ্ধশ্বাস অভিযান চালানো হয়।
অভিযানের নেপথ্যে
বিজিবি’র ৪৯ ব্যাটালিয়নের কাছে গোপন সংবাদ ছিল যে, একটি মাছের চালানে বড় ধরনের অবৈধ পণ্য বা শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা চলছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে কাস্টমস সদস্যরা ওত পেতে থাকেন। গভীর রাতে ভারতীয় ট্রাকটি বন্দরে প্রবেশের পর ৩১ নম্বর ইয়ার্ডে অবস্থান নিলে সেটিকে ঘিরে ফেলে কাস্টমস তল্লাশি দল। ট্রাকে তল্লাশি চালিয়ে দেখা যায়, বৈধ চালানের আড়ালে লুকিয়ে রাখা হয়েছে ৫ হাজার ৯৪৩ কেজি ইলিশ মাছ।
জড়িতদের প্রোফাইল ও জালিয়াতির কৌশল
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ভারতীয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আরজে ইন্টারন্যাশনাল থেকে এই মাছের চালানটি আমদানি করেছিল জান্নাত এন্টারপ্রাইজ। আর এই অবৈধ চালানটি বন্দর থেকে কৌশলে বের করে নেওয়ার দায়িত্বে ছিল বিতর্কিত ব্যবসায়ী শান্তর মালিকানাধীন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট লিংক ইন্টারন্যাশনাল।
কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, জব্দকৃত ৫৩ কার্টন ইলিশের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা। সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও উচ্চ শুল্ক এড়াতেই মূলত ‘মিথ্যা ঘোষণা’র এই কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল।
রাজস্বের ভয়াবহ চিত্র ও অসাধু কর্মকর্তাদের সখ্যতা
বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই বেনাপোল বন্দরে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৩ কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতির পেছনে জান্নাত এন্টারপ্রাইজ বা লিংক ইন্টারন্যাশনালের মতো কিছু চিহ্নিত শুল্কফাঁকিবাজ সিন্ডিকেট সরাসরি জড়িত।
অভিযোগ রয়েছে যে:
কাস্টমসের অভ্যন্তরে থাকা এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার সাথে এই সিন্ডিকেটগুলোর গভীর সখ্যতা রয়েছে।
এর আগেও বহুবার শান্তর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান অপরাধ করে ধরা পড়লেও, অদৃশ্য শক্তিবলে তাদের সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স বহাল থাকে।
অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ায় বারবার তারা একই ধরণের সাহস দেখাচ্ছে।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
বেনাপোল কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা উদ্ভব চন্দ্র পাল জানান, “গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা শতভাগ নিশ্চিত হয়েই এই অভিযানটি পরিচালনা করি। মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে ইলিশ আমদানির মাধ্যমে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাত। এই জালিয়াতির সাথে জড়িত আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাদের লাইসেন্স বাতিলের জন্য উচ্চপর্যায়ে সুপারিশ করা হবে।”
এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর বন্দর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং সাধারণ ব্যবসায়ীরা এসব অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।