• বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৩ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
শিরোনাম
গাজীপুরে মেট্রিক্স গার্মেন্টসে আগুন, ৬৭ জনকে জীবিত উদ্ধার আটতলা ভবনের তৃতীয় তলায় অগ্নিকাণ্ড, আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিট ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক চেতনায় বেনাপোলকে আধুনিক সীমান্ত নগরী গড়ার প্রত্যয়, জনআস্থার রাজনীতিতে আবু তাহের ভারত এমপি মাজেদ বাবুর বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্র ও হলফনামায় জালিয়াতির অভিযোগ হাসিনার সেই ‘৪০০ কোটির পিয়ন’ জাহাঙ্গীর: অনুসন্ধান থেকে ১০০ কোটি টাকা পাচারের মামলা, দুই বছরে কতদূর তদন্ত? পরিচয় নিয়ে নতুন বিতর্ক, কোন পক্ষ কতটা যৌক্তিক? ১৭ বছর আওয়ামী লীগের এমপির ‘ছায়াতল’ ও লটারির নাটক: পঞ্চগড়ে চালের ডিলারশিপ বাগিয়ে নেওয়া হাইব্রিড বিএনপি নেতা একরামুল হক মুন্না যশোরে আওয়ামী লীগের নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগের প্রতিবাদে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হঠাৎ ‘স্যরি’ বলল প্রথম আলো, কেন এই ক্ষমা চাওয়া? সামনে এলো আসল কারণ কবিতা, কলম ও রাষ্ট্রচিন্তায় বহুমাত্রিক পথচলা: কবি অথই নূরুল আমিনের জীবন, সাহিত্যকর্ম ও মানবিক উদ্যোগের বিস্তৃত অধ্যায় মাগুরায় যুবদল নেতা সাকের হোসেন হত্যাকাণ্ডে চাঞ্চল্যকর মোড় রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সৌজন্য সাক্ষাৎ, জাপান সফরের সাফল্য ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নিয়ে আলোচনা

জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ ও স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে গুরুতর অসঙ্গতির দাবি; রামনগর হরিপদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাড়পত্রের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন, তদন্ত ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দাবি

বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ ডেস্ক রিপোর্ট / ১৪৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬

 

মাগুরায় জাল সনদ ও বয়স কমিয়ে ১৪ বছর সরকারি চাকরির অভিযোগ

জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ ও স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে গুরুতর অসঙ্গতির দাবি; রামনগর হরিপদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাড়পত্রের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন, তদন্ত ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দাবি

মাগুরা জেলা প্রতিনিধি | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ

মাগুরায় জাল সনদপত্র, বয়সসংক্রান্ত তথ্যের অসঙ্গতি এবং স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে গরমিলের অভিযোগে প্রায় ১৪ বছর ধরে সরকারি চাকরি করার অভিযোগ উঠেছে নির্মল কুমার মালাকারের বিরুদ্ধে। তিনি মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার অধীন সব্দালপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে এমএলএসএস/নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট নথির বরাতে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগের মূল বিষয় হচ্ছে—তার জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অষ্টম শ্রেণির ছাড়পত্র, নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র, পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং স্থায়ী ঠিকানার তথ্যে কোনো অসঙ্গতি বা পরস্পরবিরোধী তথ্য রয়েছে কি না।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব নথির কোনোটি জাল, ভুয়া বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পরিবর্তিত প্রমাণিত হলে সরকারি চাকরিতে তার নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। একই সঙ্গে জাল নথি ব্যবহার করে সরকারি চাকরি নেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট আইন ও চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে এখন পর্যন্ত কোনো তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ বা আদালত নির্মল কুমার মালাকারকে জালিয়াতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেনি। ফলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে প্রশাসনিক ও আইনগত তদন্ত জরুরি।

জন্মনিবন্ধনে জন্মতারিখ ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪

অভিযোগকারীদের সরবরাহ করা জন্মনিবন্ধন সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, নির্মল কুমার মালাকারের জন্মনিবন্ধন সনদে জন্মতারিখ ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪ উল্লেখ রয়েছে।

সনদে তার স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার নাকোল ইউনিয়নের বরালিদহা গ্রামের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পিতার নাম মৃত নরেন্দ্রনাথ মালাকার এবং মাতার নাম রেনু বালা মালাকার হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ৩ জুলাই ৮ নম্বর নাকোল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হুমাউনুর রশিদ মুহিতের স্বাক্ষরিত তারিখে ওই জন্মনিবন্ধন সনদ প্রস্তুত করা হয়।

এখানে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—জন্মনিবন্ধনটি নতুন করে তৈরি, সংশোধন অথবা পুনঃনিবন্ধন করা হয়ে থাকলে তার পূর্ববর্তী রেকর্ড কী ছিল এবং পরিবর্তনের কারণ কী।

জাতীয় পরিচয়পত্রের ইস্যু তারিখ নিয়েও প্রশ্ন

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্মল কুমার মালাকারের জাতীয় পরিচয়পত্র বা ভোটার আইডি কার্ড ইস্যুর তারিখ ১০ মার্চ ২০১৮।

অন্যদিকে অভিযোগকারীদের হাতে থাকা চাকরিসংক্রান্ত নথিতে দেখা যায়, তিনি ২০১২ সালের ১৭ জানুয়ারি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে এমএলএসএস অথবা নিরাপত্তা প্রহরী পদে যোগদান করেন বলে দাবি করা হয়েছে।

এ অবস্থায় চাকরিতে আবেদন ও নিয়োগের সময় তিনি কোন পরিচয়পত্র বা বয়সের প্রমাণপত্র ব্যবহার করেছিলেন, সেই নথি যাচাই করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

অষ্টম শ্রেণির ছাড়পত্র নিয়ে বড় প্রশ্ন

অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে সামনে এসেছে রামনগর হরিপদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাড়পত্র।

অভিযোগে বলা হয়েছে, নির্মল কুমার মালাকার ওই বিদ্যালয়ে ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন বলে একটি ছাড়পত্রে উল্লেখ রয়েছে। সেখানে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯৭ তারিখে বিদ্যালয়ের যাবতীয় পাওনা পরিশোধের তথ্য রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

কিন্তু একই ছাড়পত্রে ২০০৬ সালের ২৭ এপ্রিল প্রধান শিক্ষক অতুল চন্দ্র বিশ্বাসের সিল ও স্বাক্ষর থাকার অভিযোগ উঠেছে।

অর্থাৎ ১৯৯৭ সালে শিক্ষাজীবন শেষ করার তথ্য থাকলেও ছাড়পত্রে ২০০৬ সালের স্বাক্ষর ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

এই নথিটি প্রকৃত না জাল—তা নির্ধারণের জন্য বিদ্যালয়ের মূল রেজিস্টার, ছাড়পত্র ইস্যু রেজিস্টার, সংরক্ষিত নথি এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।

সাবেক অফিস সহকারীর দাবি—‘ছাড়পত্রে আমার স্বাক্ষর নেই’

রামনগর হরিপদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক অফিস সহকারী রজব আলী শেখ দাবি করেছেন, নির্মল কুমার মালাকারের অষ্টম শ্রেণির ছাড়পত্রে তার স্বাক্ষর নেই।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ১৯৮৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ওই বিদ্যালয়ে চাকরি করেছেন। সে সময় অষ্টম শ্রেণির ছাড়পত্রে ক, খ, গ ও ঘ—চারটি অপশন থাকত। তিনি ‘ঘ’ অপশনে প্রধান সহকারীর সিল ও স্বাক্ষর দিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির সাল থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রয়োজনীয় তথ্য উল্লেখ করতেন। পাশাপাশি ভর্তি রেজিস্টারের পাতা ও সিরিয়াল নম্বরও দেওয়া হতো বলে তিনি জানান।

রজব আলী শেখের দাবি, নির্মল কুমার মালাকারের কথিত ছাড়পত্রে তার সিল ও স্বাক্ষর নেই। বরং সেখানে প্রধান শিক্ষকের সিল ও স্বাক্ষর রয়েছে।

তিনি এটিকে জালিয়াতি করে তৈরি করা ছাড়পত্র বলে দাবি করেছেন।

তবে এই বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়ের মূল নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

‘এই নামে ওই বিদ্যালয়ে পড়েননি’—সাবেক কর্মচারীর দাবি

রজব আলী শেখ আরও দাবি করেন, শ্রীপুর উপজেলার নাকোল ইউনিয়নের বরালিদহা, রাধানগরসহ দূরবর্তী এলাকার শিক্ষার্থীরা সাধারণত ওই বিদ্যালয়ে পড়তে আসতেন না।

দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে চাকরি করার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, নির্মল কুমার মালাকার নামে কোনো শিক্ষার্থী সেখানে পড়েছেন বলে তার মনে নেই।

তবে ব্যক্তিগত স্মৃতি বা দীর্ঘ চাকরির অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কোনো শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে পড়েননি—এমন সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে দেওয়া যায় না। এজন্য মূল ভর্তি রেজিস্টার, উপস্থিতির রেকর্ড, পরীক্ষার রেজিস্টার ও ফলাফল সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

১৯৯৫ সালের ভর্তি রেজিস্টার চুরি যাওয়ার দাবি

রামনগর হরিপদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অলোকা বিশ্বাস জানিয়েছেন, ১৯৯৫ সালের ষষ্ঠ শ্রেণির ভর্তি রেজিস্টার ২০১৫ সালে চুরি হয়ে গেছে।

তিনি বিষয়টি খুঁজে দেখার জন্য সময় প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রেজিস্টার চুরি যাওয়ার ঘটনায় বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কোনো সাধারণ ডায়েরি, মামলা বা প্রশাসনিক প্রতিবেদন করা হয়েছিল কি না এবং ওই সময়ের অন্য কোনো রেকর্ড সংরক্ষিত আছে কি না।

যদি মূল ভর্তি রেজিস্টার না থাকে, তাহলে একই সময়ের পরীক্ষার রেজিস্টার, বেতন রেজিস্টার, ফলাফল, ছাড়পত্র ইস্যু রেজিস্টার, পুরোনো শিক্ষক-কর্মচারীর রেকর্ড কিংবা সংশ্লিষ্ট বোর্ডের নথি থেকেও বিষয়টি যাচাই করা সম্ভব হতে পারে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের নিয়োগ নথি

অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, ৬ কাওরান বাজার, ঢাকা থেকে পাওয়া প্রবেশপত্রে পদ হিসেবে এমএলএসএস অথবা নিরাপত্তা প্রহরীর কথা উল্লেখ রয়েছে।

প্রার্থীর রোল নম্বর ৩১৭৭৮৭ এবং লিখিত পরীক্ষার ভেন্যু হিসেবে খুলনা আলিয়া মাদ্রাসার নাম উল্লেখ রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

প্রবেশপত্রটি ২০১২ সালের ১৭ জানুয়ারি সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুরের গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অসীম কুমার সাহা সত্যায়ন করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখন নিয়োগের সময় দাখিল করা মূল আবেদনপত্র, শিক্ষাগত সনদ, জন্মতারিখের প্রমাণপত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র বের করে বর্তমান নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলে প্রকৃত তথ্য পরিষ্কার হতে পারে।

২০১২ সালের ১৭ জানুয়ারি চাকরিতে যোগদানের দাবি

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে ফরিদপুর জেলার জন্য নিয়োগ পাওয়া ১২ জন এমএলএসএস অথবা নিরাপত্তা প্রহরীর মধ্যে নির্মল কুমার মালাকারও ছিলেন।

তার যোগদানের তারিখ ১৭ জানুয়ারি ২০১২ এবং কর্মস্থল জাহাপুর ইউনিয়ন, উপজেলা মধুখালী, ফরিদপুর হিসেবে উল্লেখ রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

ওই নিয়োগসংক্রান্ত নথিতে উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) পরিবার পরিকল্পনা ফরিদপুর ডা. মোড়ল ইয়াকুব আলীর স্বাক্ষর থাকার কথাও বলা হয়েছে।

২০১৩ সালে মাগুরায় বদলি

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ১৪ আগস্ট ২০১৩ সালের অফিস আদেশ অনুযায়ী নির্মল কুমার মালাকারকে মধুখালী উপজেলার কামারখালী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র থেকে বদলি করে মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার সব্দালপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে পদায়ন করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ওই আদেশে সহকারী পরিচালক (পার-১) অজয় রতন বড়ুয়ার স্বাক্ষর থাকার কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১২ সালে ফরিদপুরে চাকরিতে যোগদানের পর ২০১৩ সাল থেকে তিনি মাগুরায় কর্মরত রয়েছেন।

নিয়োগপত্রের স্থায়ী ঠিকানা বনাম জন্মনিবন্ধনের ঠিকানা

অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্থায়ী ঠিকানা।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের নিয়োগপত্রে নির্মল কুমার মালাকারের স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে—পিতা নরেন্দ্র মালাকার, গ্রাম তাতিপাড়া, ডাকঘর সদর মাগুরা, মাগুরা।

অন্যদিকে পরবর্তী জন্মনিবন্ধন সনদে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে শ্রীপুর উপজেলার নাকোল ইউনিয়নের বরালিদহা গ্রামের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

দুই নথিতে ঠিকানা ভিন্ন হলে এর প্রশাসনিক কারণ কী—এটি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

ঠিকানা পরিবর্তন আইনগতভাবে বৈধভাবে হয়ে থাকলে তার প্রমাণও থাকা উচিত। আর যদি কোনো নিয়োগ সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য পরিবর্তন করা হয়ে থাকে, সেটি আলাদা তদন্তের বিষয়।

পুলিশ ভেরিফিকেশনও যাচাইয়ের আওতায় আনার দাবি

অভিযোগে মাগুরা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের জেলা বিশেষ শাখার পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রতিবেদনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৩ অক্টোবর ২০১৯ সালের একটি ভিআর প্রতিবেদনে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ১৪৭৩১২১২৯৯ উল্লেখ রয়েছে এবং জেলা বিশেষ শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা প্রতিবেদনটি দাখিল করেন।

এখন তদন্তের স্বার্থে দেখা প্রয়োজন—পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় কোন কোন নথি যাচাই করা হয়েছিল এবং ওই সময় তার জন্মতারিখ, ঠিকানা ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য কী ছিল।

জাল ছাড়পত্র তৈরির চক্রের অভিযোগ

রামনগর হরিপদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক অফিস সহকারী রজব আলী শেখ দাবি করেছেন, অতীতে অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে জাল ছাড়পত্র তৈরির ঘটনা ঘটত।

তিনি মধুপুর স্কুলের অফিস সহকারী সুশান্ত গয়ালী নামের একজনের কথা উল্লেখ করে দাবি করেন, তার কাছে এ ধরনের জালিয়াতির কিছু নমুনাও ছিল এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে জাল ছাড়পত্র তৈরি করা হয়েছে।

তবে সুশান্ত গয়ালী নির্মল কুমার মালাকারের কথিত ছাড়পত্র তৈরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন—এমন অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। তার বক্তব্যও প্রতিবেদনের সময় পাওয়া যায়নি।

ফলে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযুক্ত নির্মল কুমার মালাকারের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে নির্মল কুমার মালাকারের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি তার সবকিছু সঠিক রয়েছে বলে দাবি করেন।

তিনি অভিযোগকারীদের উদ্দেশে বলেন, তার বিরুদ্ধে যা করার করা যেতে পারে; চাকরি চলে গেলেও তিনি ভ্যান, রিকশা চালিয়ে বা মাঠে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করবেন। একই সঙ্গে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

অর্থাৎ তিনি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেননি।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন এবং তার চাকরি ও নথিপত্র বৈধ।

পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের বক্তব্য

মাগুরা জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক গাজী বশির আহমেদ বলেন, নির্মল কুমার মালাকারের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো লিখিত আকারে আবেদন হিসেবে জমা দিতে হবে। এরপর বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রশাসনের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত তদন্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়নি।

আইনগতভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কী হতে পারে?

জাল সনদ তৈরি, জাল দলিল ব্যবহার, প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি চাকরি গ্রহণ বা সরকারি কাজে অসত্য তথ্য ব্যবহারের অভিযোগ তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে একাধিক আইনি ও প্রশাসনিক প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।

বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে জাল দলিল তৈরি, জাল দলিলকে আসল হিসেবে ব্যবহার এবং প্রতারণা সংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধের বিধান রয়েছে। কোন ধারা প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করবে তদন্তে ঠিক কী ধরনের নথি জাল বা পরিবর্তিত হয়েছে এবং কী উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার করা হয়েছে তার ওপর।

এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু চাকরিবিধির আওতায় বিভাগীয় ব্যবস্থা নয়, পরিস্থিতি অনুযায়ী ফৌজদারি মামলাও হতে পারে। তবে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা যায় না।

একইভাবে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের সময় জাল বা অসত্য তথ্য ব্যবহার প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ কর্তৃপক্ষ চাকরির বৈধতা, নিয়োগ বাতিল, বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বেতন-ভাতা বা সরকারি অর্থের বিষয়ে আইন ও বিধি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

বয়স জালিয়াতি প্রমাণিত হলে তদন্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ

সরকারি চাকরিতে বয়স একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা। নিয়োগের সময় নির্ধারিত বয়সসীমা অতিক্রম করলে চাকরির জন্য যোগ্যতা না থাকার সম্ভাবনা থাকে।

তাই নির্মল কুমার মালাকারের জন্মতারিখ বিভিন্ন নথিতে একই আছে কি না, বিশেষ করে নিয়োগের সময় ব্যবহৃত নথিতে কোন জন্মতারিখ ছিল এবং পরবর্তীতে জন্মনিবন্ধন বা অন্য কোনো নথিতে পরিবর্তন করা হয়েছে কি না—এটি তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে চাকরি পাওয়ার জন্য বয়স ইচ্ছাকৃতভাবে কম দেখানো হয়েছিল, তাহলে সংশ্লিষ্ট চাকরিবিধি ও প্রচলিত আইনের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে।

প্রশাসনের প্রতি স্থানীয়দের দাবি

অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় মাগুরা জেলা প্রশাসন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

তাদের দাবি, তদন্তে প্রথমে নিয়োগের সময় জমা দেওয়া মূল কাগজপত্র উদ্ধার করতে হবে। এরপর জন্মনিবন্ধনের ইতিহাস, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, বিদ্যালয়ের ভর্তি রেজিস্টার, ছাড়পত্র ইস্যু রেজিস্টার, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের নিয়োগ ফাইল এবং পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট একসঙ্গে যাচাই করতে হবে।

প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন পরিষদ, নির্বাচন অফিস, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে নথি যাচাই করা যেতে পারে।

প্রশাসনের কাছে ছয় দফা যাচাইয়ের দাবি

অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা বের করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে যে বিষয়গুলো যাচাইয়ের দাবি উঠেছে, সেগুলো হলো—

প্রথমত, নির্মল কুমার মালাকারের নিয়োগের সময় জমা দেওয়া মূল জন্মতারিখ ও শিক্ষাগত সনদ যাচাই।

দ্বিতীয়ত, রামনগর হরিপদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাড়পত্রটি আসল কি না এবং সেটি বিদ্যালয়ের কোন রেজিস্টারের ভিত্তিতে ইস্যু হয়েছিল তা যাচাই।

তৃতীয়ত, জন্মনিবন্ধন সনদটি ২০২২ সালে তৈরি বা সংশোধনের আগে কোনো পূর্ববর্তী রেকর্ড ছিল কি না তা যাচাই।

চতুর্থত, জাতীয় পরিচয়পত্রের আবেদনপত্রে জন্মতারিখ, পিতা-মাতার নাম ও ঠিকানা কী দেওয়া হয়েছিল তা যাচাই।

পঞ্চমত, ২০১২ সালের নিয়োগের সময়কার পুলিশ ভেরিফিকেশন ও পরবর্তী ২০১৯ সালের ভেরিফিকেশন প্রতিবেদনের তথ্য তুলনা করা।

ষষ্ঠত, নিয়োগপত্রে থাকা তাতিপাড়া, সদর মাগুরা ঠিকানা এবং পরবর্তী জন্মনিবন্ধনে থাকা বরালিদহা ঠিকানার মধ্যে পার্থক্যের কারণ যাচাই করা।

এখন প্রশাসনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা

একজন সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে জাল সনদ, বয়স কমানো এবং ঠিকানা পরিবর্তনের মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থাকা উচিত নয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

তবে একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে সরাসরি চাকরি বাতিল বা কাউকে অপরাধী ঘোষণা না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করাও জরুরি।

অভিযোগ সত্য হলে সরকারি অর্থ ও চাকরির সুযোগের অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন ও চাকরিবিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়টিও পরিষ্কার হওয়া দরকার।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করে মূল নথিগুলো যাচাই করলে দীর্ঘদিনের এই অভিযোগের প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসতে পারে।

দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা যাচ্ছে, প্রতিবেদনে উল্লিখিত জাল সনদ, বয়স কমানো, ঠিকানা গরমিল ও চাকরিতে অনিয়মের বিষয়গুলো অভিযোগ হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। এসব অভিযোগ আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করা হচ্ছে না। অভিযুক্ত নির্মল কুমার মালাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং তার সবকিছু সঠিক বলে দাবি করেছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, ইউনিয়ন পরিষদ, নির্বাচন কর্তৃপক্ষ কিংবা অন্য কোনো সংশ্লিষ্ট পক্ষের নতুন বক্তব্য বা প্রমাণ পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে। প্রয়োজন হলে প্রতিবেদন সংশোধন বা হালনাগাদ করা হবে।


More News Of This Category
bdit.com.bd