গণতান্ত্রিক জামায়াতের রাজনৈতিক উত্থান: ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও নেতৃত্বের পুনর্গঠন
আবু নাসের মহিউদ্দিন
কুয়েত প্রতিনিধি
বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনীতির ধারায় জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক উত্থান একটি দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের ফল। কয়েক দশকজুড়ে রাজনৈতিক নিপীড়ন, যুদ্ধাপরাধের বিচারে শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি এবং সাংগঠনিক নিষিদ্ধাজ্ঞার মাঝেও দলটি নিজেদের একটি গণতান্ত্রিক ও নেতৃত্বকেন্দ্রিক সংগঠন হিসেবে পুনর্গঠনের পথে এগিয়ে গেছে।
১৯৭০ এর দশকের শেষভাগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উদারনীতির ছায়াতলে জামায়াতের পুনর্জন্ম ঘটে। এরপর প্রতিকূল রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও দলটি আপসহীনভাবে নিজেদের আদর্শে অটুট থেকেছে। সেই ধারাবাহিকতায় তাদের সাম্প্রতিক বৃহৎ সমাবেশ—সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত—রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিশ্রম, ত্যাগ এবং নেতৃত্ব বিকাশের বাস্তব প্রতিফলন।
১৯৯১ সালে জামায়াত নেতা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর উপর ছাত্রলীগের পাথর নিক্ষেপ কিংবা ছাত্রনেতা আবদুল মালেকের নির্মম হত্যাকাণ্ড এই সংগঠনের অতীত যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি। এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে অনেকেই বলছেন, এই দলটি বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েও টিকে থাকা বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
জামায়াতে ইসলামীর একটি বড় শক্তি তাদের নেতৃত্ব প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ থাকলেও ছাত্রশিবির ও অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের মাধ্যমে তারা সাংগঠনিক ভিত্তি ধরে রেখেছে। ২০২৪ সালের “জুলাই বিপ্লব”-এ জামায়াতের সক্রিয় অংশগ্রহণ দলটির নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতির বহিঃপ্রকাশ ছিল। আবু সাঈদের শহীদ হওয়া সেই বিপ্লবের এক আবেগঘন অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
বিএনপি যেখানে এখনো আন্দোলনে সংগঠিত শক্তি দেখাতে ব্যর্থ, জামায়াত সেখানে নিরবচ্ছিন্ন সাংগঠনিক ক্ষমতা দেখিয়েছে। এই দিক থেকে তাদের উত্থান শুধু আদর্শিক নয়, বাস্তব রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনাতেও শক্তিশালী।
জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে গত এক দশকে চাঁদাবাজি বা দলীয় কোন্দলের মতো বড় কোনো দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসেনি। অন্যদিকে, বিএনপি বহু নেতাকে বহিষ্কার করলেও এখনও তৃণমূলে কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ব্যবধানই আগামীতে নেতৃত্ব গ্রহণে জামায়াতকে একটি ‘নতুন ধরনের ইসলামি রাজনৈতিক শক্তি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
সতর্কতা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
তবে বাস্তবতা হলো, রাজনীতিতে উত্থানের যেমন গৌরব আছে, তেমনি বিপর্যয়ের আশঙ্কাও থাকে। গতকালের সমাবেশ যতই ঐতিহাসিক হোক, তা যদি অহংকারে পরিণত হয় কিংবা বাস্তব রাজনীতির চাহিদা উপেক্ষা করে, তবে এ সাফল্য অস্থায়ী হতে বাধ্য।
জামায়াত নেতারা মনে রাখেন, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সহানুভূতি ও কৌশলগত সমর্থন তাদের অতীত উত্থানে বড় ভূমিকা রেখেছিল। আজকের রাজনীতি সেই বন্ধুত্ব নয়—তবু একটি সমঝোতামূলক রাজনীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য।
গণতান্ত্রিক জামায়াত এখন যে অবস্থানে, তা তাদের আদর্শিক দৃঢ়তা, নেতৃত্বের দক্ষতা ও মাঠপর্যায়ের শৃঙ্খলার ফল। তবে ভবিষ্যৎ রাজনীতি আরও বেশি সহনশীলতা, বাস্তববাদিতা এবং গণতান্ত্রিক মানসিকতার দাবি রাখে।
সাধারণ মানুষ এখন সংঘর্ষ নয়, একটি বাস্তবভিত্তিক ও ন্যায়নিষ্ঠ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা দেখতে চায়। যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে ধ্বংস না করে জনগণের কল্যাণে নিজেদের শক্তিকে কাজে লাগাবে—সেই আশার আলো এখনও বাংলাদেশে জ্বলছে।