“কমপ্লিট শাটডাউন” অব্যাহত থাকবে: গুম হওয়ার আগে ছাত্রনেতা নাহিদের শেষ বার্তা দেশবাসীর উদ্দেশে
ঢাকা, ১৯ জুলাই ২০২৫ |
একটি নিঃশব্দ রাত, যার নীরবতা ছিন্ন করেছে এক অপ্রচারিত বার্তা।
রাত ১০টা ৪৫ মিনিট, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়েছে মোবাইল ম্যাসেজ—
“কমপ্লিট শাটডাউন চলবেই”—এটাই ছিল মো. নাহিদ ইসলামের শেষ বার্তা, এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ।
গত ৫ জুন ২০২৪, হাইকোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ে ২০১৮ সালের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কোটা-বিষয়ক পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১ জুলাই থেকে “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন” ব্যানারে দেশজুড়ে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ঐক্যবদ্ধভাবে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেয়।
তাদের দাবি ছিল একটাই—সমাজের সকল শ্রেণির ছাত্রদের জন্য সমান সুযোগ ও সংসদের মাধ্যমে কোটা সংস্কারের আইনি নিশ্চয়তা।
কিন্তু সরকারের নির্লজ্জ উদাসীনতা এবং প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক অপমানজনক মন্তব্য শুধু শিক্ষার্থীদের অপমান করেনি, বরং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভবিষ্যতকে সংকটে ফেলে দিয়েছে। এরই ফলশ্রুতিতে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে অস্থিরতা, রক্তপাত, এবং দমন-পীড়নের ভয়ঙ্কর চিত্র।
গতকাল সন্ধ্যা থেকে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে “Complete Digital Crackdown”—ইন্টারনেট, ব্রডব্যান্ড, মোবাইল নেটওয়ার্ক, মোবাইল ফাইন্যান্স, এমনকি ATM সেবা পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ।
এই পরিস্থিতিতে আন্দোলনের নেতৃত্বাধীন সমন্বয়ক ও সহ-সমন্বয়করা কার্যত বিচ্ছিন্ন অবস্থায়, যোগাযোগহীন। বার্তাটি যে রাত ১০:৪৫ মিনিটে পাঠানো হয়েছিল, তা ছিল আন্দোলনের সর্বশেষ সংগঠিত ঘোষণাগুলোর একটি। এরপর থেকেই মো. নাহিদের অবস্থান অজ্ঞাত।
তিনি তাঁর বার্তায় বলেন—
“নাগরিকের ডিজিটাল যোগাযোগের মৌলিক অধিকার হরণ হচ্ছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চূড়ান্ত রূপ। অবিলম্বে ইন্টারনেট সচল করতে হবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজপথ থেকে সরাতে হবে, ক্যাম্পাস খুলে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।”
নাহিদ তাঁর বার্তায় শহীদদের জন্য মাগফিরাত কামনা করেন এবং বলেন—
“সারা দেশের হত্যাকাণ্ডের দায় সম্পূর্ণভাবে সরকারকেই নিতে হবে। আমরা ছাত্র-জনতার সংগ্রামের পক্ষে অটল আছি।”
তিনি আন্তর্জাতিক ও জাতীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানান যেন তারা সরকারের নির্মম নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ছিল তাঁর বার্তার শেষে—
“সেনাবাহিনীর প্রতি আমাদের অনুরোধ, খুনি সরকারের পক্ষ না নিয়ে ছাত্র-জনতার মানবাধিকার রক্ষায় পাশে দাঁড়ান।”
এই আহ্বান যেন শুধু একটি কৌশলগত বার্তা নয়, বরং দেশ রক্ষার জন্য একটি নৈতিক ডাক।
‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচী চলবে—এটাই ছিল তাঁর শেষ প্রতিজ্ঞা।
বাংলাদেশের গণমানুষের এই ইতিহাস আজ রক্তাক্ত, তবু কলম থেমে যাবে না।
চোখ থাকবে সেই ছাত্রনেতার প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায়, যিনি হয়ত আজ নিখোঁজ, কিন্তু চেতনায় অমলিন।