অনলাইনে ডাক্তারদের পণ্য বিক্রির মহোৎসব: আইনের তোয়াক্কা করছেন না জাহাঙ্গীর কবির!
বিশেষ প্রতিবেদন | ঢাকা
চিকিৎসাসেবা নাকি ব্যবসা? এই প্রশ্ন এখন জনমনে। ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের নামে পরিচালিত ফেসবুক পেজগুলো থেকে যেভাবে ‘সেক্স ড্রাগ’ বা যৌন উত্তেজক সাপ্লিমেন্টের চটকদার বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে, তাতে আইনের চরম লঙ্ঘন দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ডাক্তার পরিচয় ব্যবহার করে সরাসরি পণ্য বিক্রির এই ‘হকার স্টাইল’ বিপণন পদ্ধতি চিকিৎসা পেশাকে কলঙ্কিত করছে বলে দাবি উঠেছে।
আইনি বেড়াজালে আটকা পড়তে পারেন জাহাঙ্গীর কবির:
১. রেজিস্ট্রেশন বাতিলের ঝুঁকি (BMDC আইন): বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের (BMDC) নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো নিবন্ধিত চিকিৎসক সরাসরি কোনো বাণিজ্যিক পণ্যের মডেল হতে পারেন না বা ড্রাগ বুস্ট করে বিক্রি করতে পারেন না। এই অপরাধ প্রমাণিত হলে ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের চিকিৎসা সনদ (License) স্থগিত বা বাতিল হওয়ার বিধান রয়েছে।
২. ওষুধ প্রশাসনের (DGDA) কঠোর নিষেধাজ্ঞা: বাংলাদেশে যেকোনো ওষুধ বা হেলথ সাপ্লিমেন্ট বিক্রির জন্য ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক। বিজ্ঞাপনে ‘বাঘের মতো গর্জন’ বা ‘স্থায়িত্ব বৃদ্ধি’র মতো অবৈজ্ঞানিক শব্দ ব্যবহার করা ওষুধ নিয়ন্ত্রণ আইন-২০২৩ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর জন্য ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা জরিমানার ব্যবস্থা রয়েছে।
৩. ডিজিটাল বিজ্ঞাপনী অপরাধ: বিটিআরসি (BTRC) এবং সাইবার ক্রাইম ইউনিটের নির্দেশনা অনুযায়ী, বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে অনলাইনে বুস্টিং করা দণ্ডনীয় অপরাধ। ‘১টা কিনলে ১টা ফ্রি’ অফার দিয়ে সেনসিটিভ ওষুধ বিক্রি করা মূলত সাধারণ মানুষের সরলতাকে পুঁজি করে এক ধরণের ডিজিটাল জালিয়াতি।
ভোক্তাদের জন্য সতর্কতা:
বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত ‘প্রাকৃতিক’ বা ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মুক্ত’ কথাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এই ধরণের অননুমোদিত সেক্স ড্রাগে অনেক সময় ক্ষতিকর সিলডেনাফিল (Sildenafil) মেশানো থাকে, যা সরাসরি হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞের মন্তব্য:
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “একজন ডাক্তার যখন প্রেসক্রিপশন ছেড়ে দোকানের হকারের মতো ফেসবুক লাইভে বা বুস্ট করা ভিডিওতে ওষুধ বিক্রি শুরু করেন, তখন তা আর সেবা থাকে না—তা হয়ে দাঁড়ায় প্রতারণা। প্রশাসনের উচিত অবিলম্বে এসব পেজ বন্ধ করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।”
এই জাতীয় ওষুধে অনেক সময় ক্ষতিকর রাসায়নিক যেমন সিলডেনাফিল (Sildenafil) বা তাদালাফিল (Tadalafil) অতিরিক্ত মাত্রায় মেশানো থাকে।
নিচে এসব ওষুধের মারাত্মক ক্ষতিগুলো তুলে ধরা হলো:
১. হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি
যৌন উত্তেজক ওষুধ রক্তচাপের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। যাদের আগে থেকেই হার্টের সমস্যা বা উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাদের ক্ষেত্রে এই ওষুধ সেবনের ফলে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক বা ব্রেইন স্ট্রোক হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
২. কিডনি বিকল হওয়া
অনলাইনে বিক্রি হওয়া এসব সাপ্লিমেন্টে অনেক সময় ভারী ধাতু (Heavy Metals) বা ক্ষতিকর কেমিক্যাল থাকে। আমাদের শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয় কিডনি। অতিরিক্ত কেমিক্যালযুক্ত এসব ওষুধ নিয়মিত খেলে খুব দ্রুত কিডনি অকেজো হয়ে যায়।
৩. লিভারের ক্ষতি
লিভার বা কলিজা এই সব ড্রাগের রাসায়নিক উপাদানগুলো ভাঙতে গিয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে জন্ডিস, লিভার সিরোসিস বা লিভার ফেইলিউর হতে পারে।
৪. স্থায়ী যৌন অক্ষমতা
সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা হলো, সাময়িক সক্ষমতা বাড়ানোর আশায় এসব ওষুধ খেলে একটা সময় শরীরের স্বাভাবিক হরমোন ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ব্যক্তি স্থায়ীভাবে যৌন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং ওষুধ ছাড়া তার শরীর আর স্বাভাবিক সাড়া দেয় না।
৫. দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি হ্রাস
অতিরিক্ত সেবনের ফলে চোখের অপটিক নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার ফলে মানুষ অন্ধ হয়ে যেতে পারে। এছাড়া কানে কম শোনা বা শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৬. প্রায়াপিজম (Priapism)
এটি একটি যন্ত্রণাদায়ক অবস্থা যেখানে দীর্ঘ সময় (৪ ঘণ্টার বেশি) লিঙ্গ উথ্বিত হয়ে থাকে। সময়মতো চিকিৎসা না করালে লিঙ্গের টিস্যু নষ্ট হয়ে যায় এবং ব্যক্তি সারাজীবনের জন্য অক্ষম হয়ে পড়ে।
৭. মানসিক সমস্যা ও বিষণ্নতা
এই সব ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব, চরম অস্থিরতা, মাথাব্যথা এবং দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্নতা (Depression) তৈরি হয়।
সারাংশ টেবিল:
অঙ্গ/বিভাগ ক্ষতির ধরণ
হৃদপিণ্ড হার্ট অ্যাটাক, উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন।
কিডনি ও লিভার কিডনি ড্যামেজ, লিভার সিরোসিস।
চোখ ও কান ঝাপসা দৃষ্টি, অন্ধত্ব, শ্রবণশক্তি লোপ।
যৌন স্বাস্থ্য স্থায়ী পুরুষত্বহীনতা, শুক্রাণু কমে যাওয়া।
মানসিক ড্রাগের ওপর নির্ভরশীলতা, তীব্র মাথাব্যথা, অনিদ্রা।
পরামর্শ: আপনার যদি শারীরিক কোনো সমস্যা থাকে, তবে কোনো ফেসবুক পেজ বা “অনলাইন হকার” ডাক্তারের ভিডিও দেখে ওষুধ না কিনে সরাসরি একজন ইউরোলজিস্ট (Urologist) বা এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট (Endocrinologist) দেখান। জীবন আপনার, তাই সস্তার বিজ্ঞাপনে পড়ে তা ধ্বংস করবেন না।