অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা না কি ব্যক্তিগত এজেন্ডা: জুলকারনাইন সায়েরকে নিয়ে নতুন বিতর্ক
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
জুলকারনাইন সায়ের খান (সামি)-এর বিতর্কিত অতীত, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ভূমিকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর ওপর ভিত্তি করে একটি বিস্তারিত সংবাদ প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো:
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা না কি ব্যক্তিগত এজেন্ডা: জুলকারনাইন সায়েরকে নিয়ে নতুন বিতর্ক
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
সম্প্রতি আল-জাজিরার আলোচিত তথ্যচিত্র “All the Prime Minister’s Men”-এর প্রধান চরিত্র জুলকারনাইন সায়ের খান (সামি)-এর বর্তমান ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। একদিকে সেনাপ্রধান ও বিএনপির প্রতি নমনীয়তা, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি কঠোর অবস্থান—তার এই ‘দ্বিমুখী’ নীতি তাকে একজন পেশাদার সাংবাদিকের চেয়ে বেশি ‘রাজনৈতিক সুবিধাবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বিশ্লেষকরা।
১. সামরিক রেকর্ড ও বিএমএ থেকে বহিষ্কার
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (ISPR) এবং সেনাসূত্রের তথ্যমতে, জুলকারনাইন সায়ের খানের সামরিক জীবন শুরুতেই হোঁচট খায়। মাদকাসক্তি এবং গুরুতর শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাকে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (BMA) থেকে বহিষ্কার করা হয়। ২০০৬ সালে তাকে দেশের সকল সেনানিবাসে ‘অবাঞ্ছিত’ (Persona Non Grata) ঘোষণা করা হয়েছিল। সেনাবাহিনীর পোশাক ও ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করে প্রতারণার দায়ে তিনি একাধিকবার মিলিটারি পুলিশের হাতে গ্রেফতারও হয়েছিলেন। যদিও বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি মাদকাসক্তির বিষয়টি অস্বীকার করে একে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে দাবি করেন।
২. স্বার্থের সংঘাত ও পক্ষ পরিবর্তন
বিশ্লেষকদের মতে, জুলকারনাইন একসময় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার এবং সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারা এবং আর্থিক স্বার্থের দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে তিনি পক্ষ পরিবর্তন করেন। এই বিরোধের জের ধরেই তিনি আল-জাজিরার মাধ্যমে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের দুর্নীতির তথ্য ফাঁস করেন। সাধারণ মানুষের কাছে এটি সাহসিকতা হিসেবে গণ্য হলেও, সমালোচকদের দাবি—এটি ছিল নিছক ‘ব্যক্তিগত ক্ষোভের’ বহিঃপ্রকাশ।
৩. রাজনৈতিক দালালি ও ‘বিএনপি প্রীতি’র অভিযোগ
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব জ্যাকব মিল্টনসহ অনেক বিশ্লেষক দাবি করেছেন, জুলকারনাইন বর্তমানে নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের (বিএনপি) এজেন্ডা বাস্তবায়নে সক্রিয়।
জামায়াত বিরোধিতার আড়ালে কৌশল: তিনি জামায়াতে ইসলামীর কড়া সমালোচনা করলেও বিএনপির কোনো নেতিবাচক কর্মকাণ্ড নিয়ে মুখ খুলছেন না।
সেনাপ্রধান ইস্যু: বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে নিয়ে তার ইতিবাচক অবস্থান এবং বিএনপির প্রতি তার নমনীয়তা প্রমাণ করে যে, তার সাংবাদিকতা আদর্শিক নয় বরং স্বার্থ-চালিত।
৪. হাদি হত্যাকাণ্ড ও আসামিদের রক্ষার তৎপরতা
চট্টগ্রামের ইনকিলাব মঞ্চের কর্মী শরিফ ওসমান হাদি হত্যার ঘটনায় জুলকারনাইনের ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তিনি ঘটনার মূল আসামিদের বাঁচাতে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছেন এবং বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছেন। তার এই তৎপরতা তাকে একজন ‘পেশাদার সাংবাদিক’ হিসেবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
৫. সুবিধাবাদী সাংবাদিকতার তকমা
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অতীতে তিনি দেশের কল্যাণে কিছু কাজ করলেও বর্তমানে তার কর্মকাণ্ড দেশের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বিদেশে বসে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মেরুকরণ সৃষ্টি এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে তথ্যকে ব্যবহার করা তাকে একজন ‘সুবিধাবাদী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
জুলকারনাইন সায়ের খানের সাংবাদিকতা কি আসলেই জনগণের স্বার্থে, নাকি এটি কোনো গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ—তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। তবে তার বিতর্কিত সামরিক রেকর্ড এবং বর্তমানের সিলেক্টিভ সাংবাদিকতা তার বিশ্বাসযোগ্যতাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
তথ্য সূত্র:
জ্যাকব মিল্টন ফেসবুক পোস্ট