প্রকাশিত: ৮ জুলাই ২০২৫
নাজমুল হাসান
‘ফ্যাক্টচেক’ নয়, ‘ফেইকপ্রচার’ — সাংবাদিকতার নামে যদি বিভ্রান্তি ছড়ায়, জবাবদিহি করবে কে?
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা একটি সংকটময় বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। এখন আর সাংবাদিকরা কেবল হুমকির শিকার নন — অনেক সময় তারাই হুমকির উৎসে পরিণত হচ্ছেন। আর সবচেয়ে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এই সাংবাদিকতার ছদ্মবেশী সহিংসতা হচ্ছে তথাকথিত ‘অনলাইন এডিটরস এলায়েন্স’ নামধারী পেশাদার গ্রুপগুলোর চুপচাপ সহায়তায়।
তাদের নীরবতা এবং আত্মসমালোচনার অভাব আজ প্রশ্নের মুখে ফেলেছে পুরো অনলাইন সাংবাদিকতা কাঠামোকে।
এক বিস্ময়কর ট্রেন্ড: ‘ফ্যাক্টচেক’ দিয়ে ভিকটিমকে আরও ভিক্টিমাইজ!
সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বেশ কয়েকটি অনলাইন নিউজপোর্টাল এবং ফ্যাক্টচেক ভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে —
➡️ সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো একটি ভুয়া খবরের ফলোআপে যখন ‘ফ্যাক্টচেক’ রিপোর্ট করা হয়,
➡️ তখন সেটিকে ‘যা জানা গেল’, ‘বলা হচ্ছে…’, ‘তদন্তে যা উঠে এলো’-জাতীয় হেডলাইন দিয়ে এমনভাবে পরিবেশন করা হয়,
➡️ যাতে পাঠকের মনে হয় ভিকটিমই আসলে দোষী অথবা সন্দেহভাজন।
এই প্রতিবেদনে আসল উদ্দেশ্য থাকে “তথ্য সংশোধন” নয়, বরং ভিকটিমের বিরুদ্ধে আরেক দফা মিডিয়া ট্রায়াল।
নারীনেত্রীদের বিরুদ্ধে এই অপকৌশল আরও ভয়াবহ
বিশেষ করে নারী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফেইক নিউজকে মিডিয়া যখন ফ্যাক্টচেক আড়ালে আবার হাইলাইট করে — তখন আসলে মিডিয়াই হয়ে উঠছে সাইবার সহিংসতার বৈধ প্ল্যাটফর্ম।
এ ধরনের রিপোর্টের পর দেখা গেছে:
ভিকটিমের পরিবার ও সন্তানদের মানসিক ভাঙন
রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে স্থায়ী ক্ষতি
আর সর্বোপরি, সমাজে নির্লজ্জভাবে চরিত্রহননের বৈধতা লাভ
প্রশ্ন কিন্তু এড়ানো যায় না: অনলাইন এডিটরস এলায়েন্স কই?
আমরা দেখি:
যখন কোনও সাংবাদিক হুমকির মুখে পড়েন, তখন একাত্মতা ও প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে
কিন্তু সেই সাংবাদিক বা তার সম্পাদিত অনলাইন সেকশন যদি অন্যের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকরভাবে ফ্যাক্টচেক চালিয়ে দেন — তখন কোনও আত্মসমালোচনা নেই
দায়ী সম্পাদকদের বিরুদ্ধে কোনও স্টেটমেন্ট নেই
ভুল উপস্থাপনার কোনও সংশোধন নেই
এই নীরবতা কি কেবল নির্লজ্জতা, নাকি এটি আর্থিক ও রাজনৈতিক দায়মুক্তির সুবিধাজনক কৌশল?
— এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা
অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন এডিটর শাখা
সেখানে নেই যথাযথ ট্রেনিং, নেই রিভিউ সিস্টেম, নেই জবাবদিহিতা।
বিভ্রান্তিকর হেডলাইন সংস্কৃতি
‘ক্লিক’ পাওয়ার নেশায় ‘অর্ধসত্য’কে ‘পূর্ণদায়িত্বপূর্ণ সংবাদ’ হিসেবে চালানো হচ্ছে।
ফ্যাক্টচেক রিপোর্টের রাজনৈতিক ব্যবহার
মূল উদ্দেশ্য থাকে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে অপদস্থ করা, তথ্য সংশোধন নয়।
—
এখন সময় এসেছে অনলাইন এডিটরস এলায়েন্স, প্রেস কাউন্সিল, সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং সাংবাদিকতার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে শপথ নিতে হবে — “দায়িত্বহীন সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে সাংবাদিকতার পক্ষেই দাঁড়াবো।”
✅ বিভ্রান্তিকর ফ্যাক্টচেক রিপোর্টগুলোর পুনঃমূল্যায়ন
✅ দায়ী সম্পাদকদের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ
✅ গঠনমূলক আত্মসমালোচনার চর্চা
✅ ‘সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত বিভ্রান্তি’ যেন আর কখনও ভিকটিমদের জীবনে ট্র্যাজেডির জন্ম না দেয়
> সাংবাদিকতা যদি সত্যের পক্ষে না দাঁড়ায়, তবে তা কেবল শব্দের অনুশীলন — ন্যায়বিচারের নয়।
ফ্যাক্টচেক নয়, যদি তা ভিকটিমকে আরও বিভ্রান্ত করে — সেটি একটি মারাত্মক মিডিয়া মিসফায়ার।
এখনই সময় মুখোশ খুলে নিজের মুখোমুখি হওয়ার।
—
প্রস্তুত থাকুন। প্রশ্ন করবেন, জবাব দাবি করবেন। এটাই দায়িত্বশীল পাঠক এবং নাগরিকের কর্তব্য।