বেনাপোল কাস্টমস সুপার জাহাঙ্গীরের বেপরোয়া আচরণ: যাত্রী হয়রানিতে শূন্যের কোটায় আন্তর্জাতিক যাতায়াত
নিজস্ব প্রতিবেদক, বেনাপোল | বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট কাস্টমসে কর্মরত সুপার জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে সাধারণ পাসপোর্টযাত্রীদের চরম হয়রানি, মালামাল লুটপাট এবং অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর একই স্টেশনে খুঁটি গেড়ে বসা এই কর্মকর্তার দাপটে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন ভারত-বাংলাদেশ যাতায়াতকারী যাত্রীরা। ফলে এই রুট দিয়ে যাত্রী যাতায়াত আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সরকারের রাজস্ব খাতে।
নিয়ম না মেনে ব্যক্তিগত পণ্য জব্দ
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ল্যাগেজ রুলস অনুযায়ী একজন যাত্রী নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য শুল্কমুক্ত বা স্পট ট্যাক্স দিয়ে আনার বৈধ অধিকার রাখলেও সুপার জাহাঙ্গীর তা তোয়াক্কা করছেন না। ভারত থেকে চিকিৎসা শেষে ফেরা যাত্রী সুজয় বলেন, “আমি বাড়ি ফেরার সময় একটি কম্বল কিনে এনেছিলাম। কিন্তু জাহাঙ্গীর সাহেব কোনো কথা না শুনেই সেটি কেড়ে নেন। সখের একটি পণ্যও আমরা বাড়িতে নিতে পারছি না।” এমনকি ভারতীয় নাগরিক দীপঙ্কর সাহাও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বাংলাদেশে আত্মীয়র বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ছোটখাটো উপহার নিয়ে আসলেও তা রেখে দেওয়া হচ্ছে। বেনাপোল কাস্টমসের আচরণে এখন বাংলাদেশে আসতেই ভয় লাগে।”
সাড়ে তিন বছরের ‘রাজত্ব’ ও রাজনৈতিক ছত্রছায়া
সূত্র জানায়, জাহাঙ্গীর আলম সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য শেখ আফিল উদ্দিনের তদ্বিরে বেনাপোলে পোস্টিং পান। ছাত্রলীগের সাবেক ক্যাডার পরিচয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে এখানে নিজের প্রভাব বিস্তার করে আছেন। ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি বদলালেও জাহাঙ্গীরের দৌরাত্ম্য বরং আরও বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আগে রাজনৈতিক চাপে কিছুটা নমনীয় থাকলেও এখন তিনি সাধারণ যাত্রীদের ওপর প্রতিশোধমূলক আচরণ করছেন।
ধ্বংস হচ্ছে কোটি টাকার পণ্য
চেকপোস্ট কাস্টমস হাউসের ভেতরের চিত্র আরও ভয়াবহ। জানা গেছে, সুপার জাহাঙ্গীরের ব্যক্তিগত জেদের কারণে আটকে রাখা শত শত যাত্রীর মালামাল এখন দোতলার বারান্দা, বাথরুমের পাশে এবং গেস্ট রুমে স্তূপ হয়ে পড়ে আছে। কোটি কোটি টাকার এসব পণ্য নিয়মানুযায়ী নিলামে না তোলায় তা পচে নষ্ট হচ্ছে। একজন এনজিও কর্মী জানান, “এখানে কোনো নিয়ম নেই। পণ্যগুলো নষ্ট হচ্ছে, অথচ এগুলো সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বা নিলাম করার কোনো উদ্যোগ নেই।”
রাজস্ব ও যাত্রী সংখ্যায় ধস
স্থানীয়দের দাবি, ভারত থেকে ভিসা প্রাপ্তিতে জটিলতার পাশাপাশি কাস্টমসের এই ভয়াবহ হয়রানির কারণে বেনাপোল দিয়ে যাত্রী পারাপার প্রায় ৯০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। যাত্রীরা হয়রানি এড়াতে অন্য রুট ব্যবহারের চেষ্টা করছেন অথবা ভ্রমণ থেকে বিরত থাকছেন। এতে প্রতিদিন সরকার বিপুল পরিমাণ ভ্রমণ কর (Travel Tax) থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
জনমনে প্রশ্ন: কেন বদলি নেই?
সাধারণত কাস্টমসের মতো সংবেদনশীল জায়গায় একজন কর্মকর্তার ২ বছরের বেশি থাকার নিয়ম না থাকলেও জাহাঙ্গীর আলম কীভাবে সাড়ে তিন বছর ধরে একই পদে বহাল আছেন, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ওপর মহলে মোটা অঙ্কের মাসোহারা এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েই তিনি এই পদটি ধরে রেখেছেন।
বেনাপোল বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা মনে করেন, অবিলম্বে এই বিতর্কিত কর্মকর্তাকে সরিয়ে দক্ষ ও মার্জিত কোনো কর্মকর্তাকে দায়িত্ব না দিলে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম এই স্থলবন্দরের গুরুত্ব ও রাজস্ব আয় তলানিতে গিয়ে ঠেকবে।